June 27, 2026, 7:49 pm
শিরোনাম:
সাতকানিয়ায় পুরানগড়ে চুরি প্রতিরোধে সচেতন নাগরিক কমিটি গঠন, নিরাপত্তা জোরদারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান যেখানে পাখিরা চেয়েছিল একটু নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে মানুষ নামল উচ্ছেদের নোংরা খেলায়! ময়মনসিংহে গণভোটের রায়বাস্তবায়ন ও জনদুর্গভোগ লাঘবের দাবিতে বিভাগীয় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালকের সঙ্গে ঢাকাস্থ বাঁশখালী সমিতির নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ জিয়ানগরে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মিড-ডে মিলের খাদ্যসামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগ জিয়ানগরে তামাকবিরোধী জনসচেতনতামূলক সভা তামাককে ‘না’ বললেই গড়া সম্ভব সুস্থ সমাজ: এমপি মাসুদ সাঈদী গ্লোবাল কনজ্যুমার এন্ড হিউম্যান রাইটস ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের উদ্যোগে পোষা প্রাণীদের জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিন ক্যাম্প অনুষ্ঠিত নরসিংদীর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মাদক ছাড়তে হবে অন্যথায় এলাকা ছাড়তে হবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

যেখানে পাখিরা চেয়েছিল একটু নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে মানুষ নামল উচ্ছেদের নোংরা খেলায়!

শাহরিয়ার কবির, খুলনা

মাথার ওপর ডানা ঝাপটানোর ব্যাকুল শব্দ। কোনো গাছে বুক দিয়ে ডিম আগলে বসে আছে মা পাখিটি, পরম মমতায়। ঠিক পাশের ডালেই ক্ষুধার্ত ছানার হা করা মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে ক্লান্ত বাবা পাখি। ভোরের আলো ফুটতেই যে গ্রামের ঘুম ভাঙে হাজারো বক আর পানকৌড়ির সম্মিলিত কলকাকলিতে, সেখানে পা রাখলে মুহূর্তের জন্য থমকে যেতে হয়। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের শাহপুর গ্রামে ঢুকলে মনে হবে—এ যেন মানুষের কোনো বসতি নয়, বুক পেতে দেওয়া প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া এক টুকরো স্বর্গ।
বিগত দুটি বছর ধরে বুক ভরা ভরসা নিয়ে এই গ্রামের গাছপালাগুলোকে আপন করে নিয়েছে অবলা বক ও পানকৌড়িসহ অন্যান্য পাখি। কিন্তু প্রকৃতির এই চোখ জুড়ানো, প্রাণ জুড়ানো সৌন্দর্যের পিঠোপিঠিয়েই এখন দানা বাঁধছে এক বীভৎস, নির্মম বাস্তবতা। সরেজমিনে শাহপুর গ্রামটি ঘুরে যখন স্থানীয়দের সাথে কথা বলছিলাম, তখন স্পষ্ট টের পাওয়া গেল—এই অবলা, নিষ্পাপ পাখিদের মাথার ওপর এখন ঝুলছে এক নিষ্ঠুর উচ্ছেদের খড়্গ!
গ্রামের একটি বড় অংশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ পাখিগুলোকে পরম ভালোবাসায় আগলে রাখলেও, সমাজের কিছু মানুষের চোখে তা এখন চরম ‘বিরক্তি’ আর ‘ক্ষতি’র কারণ। ফসলের সামান্য ক্ষতি কিংবা বিষ্ঠার খোঁড়া অজুহাত তুলে একদল মানুষ প্রতিনিয়ত এই পরিযায়ী ও বন্যপাখিগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, দেশের প্রচলিত আইনি প্রতি তোয়াক্কা না করে, লোকচক্ষুর আড়ালে, রাতের অন্ধকারে পাখির বাসাগুলো ভেঙে ফেলার এবং প্রজননক্ষম গাছের ডালপালা কেটে ফেলার মতো জঘন্য ও অমানবিক পাঁয়তারা চলছে এখানে। অবলা জীবগুলোর নিরাপত্তা দিতে স্থানীয় কিছু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ দিন-রাত পাহারা দিলেও, প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা এই অশুভ হুমকির মুখে তারা আজ বড্ড অসহায়, কোণঠাসা।


স্থানীয় কয়েকজন সচেতন মানুষের সাথে কথা বললে তারা এই প্রতিবেদকের কাছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “এত পাখি আমাদের এলাকায় এর আগে কখনো আসেনি। এটি আমাদের পুরো সাতক্ষীরার গৌরব, প্রকৃতির আশীর্বাদ। আমরা স্থানীয়ভাবে বুক দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করছি ঠিকই, কিন্তু যেভাবে কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হিংস্রভাবে পাখির বাসা ধ্বংসের চেষ্টা করছে, তাতে যেকোনো সময় বড় বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। এই অবলা জীবগুলোকে রক্ষায় এখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি সুরক্ষার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।”
একই সুর শোনা গেল স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষকের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি একটি জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র হতে পারত, সেখানে কিছু মানুষের চরম অজ্ঞতা আর নিষ্ঠুরতায় আজ এই সম্পদ ধ্বংসের মুখে। প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।”
সরেজমিনে শাহপুর গ্রামের এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার পর একটি বিষয় কাঁচের মতো স্পষ্ট—কোনো ব্যক্তি বা স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর পক্ষে একা লড়াই করে এই বিশাল অভয়ারণ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের যে শক্তিশালী ধারা রয়েছে, এই অবলা পাখিদের বাঁচাতে এখন সেই আইনের ঢাল আর কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। অবাধ শিকার, নির্বিচার গাছ কাটা আর জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের দিনে শাহপুর গ্রামটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যখন এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে, তখন এই প্রাকৃতিক সম্পদকে বাঁচাতে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে এলাকাবাসী।


তাই এখনই উপযুক্ত সময় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগের পক্ষ থেকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। স্থানীয়দের তীব্র দাবি—প্রশাসন যেন আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই এলাকাটি পরিদর্শন করে এবং দেশের প্রচলিত আইনের আলোকেই এটিকে সরকারিভাবে একটি ‘স্থায়ী পাখির অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। একই সাথে, যারা এই নিরাপদ আশ্রয়টি ভেঙে ফেলার এবং পাখিদের উচ্ছেদ করার নোংরা খেলায় মেতেছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনকারী সেইসব ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক। নতুবা, খুব দ্রুতই হয়তো শাহপুরের এই পাখির স্বর্গরাজ্য কেবলই খবরের কাগজের পাতায় মানুষের নির্মমতার এক কালো ইতিহাস হয়ে টিকে থাকবে।
এই বিষয়ে জানতে সাতক্ষীরা সামাজিক বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা প্রিয়াঙ্কা হাওলাদারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এই অনন্য অভয়ারণ্যটি রক্ষায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য বা কার্যকর আশ্বাস জানা সম্ভব হয়নি।
তবে বিষয়টি নিয়ে আশার আলো দেখিয়েছেন তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা। এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে শাহপুর গ্রামের পাখির অভয়ারণ্যের ওপর হুমকির বিষয়টি জানতে পেয়ে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল সাড়া দেন। ইউএনও জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, “বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না, আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা দ্রুতই সরেজমিনে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করব এবং এ বিষয়ে সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথেও কথা বলব। কীভাবে পাখিগুলোকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা যায়—প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সেই বিষয়ে সর্বোচ্চ নজর দেব।