রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ২নং কুর্শা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বিস্নপুর কামারপাড়ায় যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। যে বয়সে মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর কথা, খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা সেই বয়সেই সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে (১১) বছর বয়সী অপূর্ব চন্দ্র রায়কে।
অপূর্বের মা স্যামলী রানি রায় (৩৬) জানান, তার স্বামী সানু ভুষুন রায় (৪৪) দীর্ঘদিন লিভারের জটিল রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসার পেছনে প্রায় দেড় বছরে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়ে যায়। সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার পর অবশেষে চার মাস আগে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যু যেন শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয়নি, সঙ্গে নিয়ে গেছে পরিবারের স্বচ্ছলতাও।
তিনি বলেন, “আমাদের কোনো জমিজমা নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব ছেলের কাঁধে এসে পড়েছে। তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতে হয়।
অভাবের মধ্যেও সন্তানদের স্বপ্ন ছাড়তে রাজি নন স্যামলী। তিনি বলেন, আমার বড় ছেলে আর ছোট মেয়ে দুজনেই পড়াশোনায় খুব ভালো। অনেক কষ্ট হলেও আমি চাই তারা পড়াশোনা করে একদিন বড় অফিসার হোক।
অপূর্ব চন্দ্র রায়, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সে তারাগঞ্জের সায়েন্স ল্যাব স্কুলে পড়ে। তার ছোট বোন নীলা রানি (৯) একই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। বাবার মৃত্যুর পর তাদের জীবনে নেমে আসে কঠিন বাস্তবতা।
অপূর্ব বলে, আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসারে অনেক অভাব নেমে এসেছে। বাবার একটা মুদির দোকান ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর দোকানটা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলাকার কিছু ভালো মানুষের সাহায্যে আবার দোকানটা চালু করি।
এখন অপূর্বের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। সকাল বেলা বোনকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় স্কুলের উদ্দেশ্যে। যদি হাতে কিছু টাকা থাকে, তবে ভ্যানে যায়, না থাকলে পায়ে হেঁটেই ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার যাওয়া আসা করেন। দুপুরে বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই আবার ছুটতে হয় দোকানে।
অপূর্ব বলে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে বসি। বেচাকেনা করি। আগে খেলাধুলা করতাম, এখন আর সময় পাই না।
কথাগুলো বলতে বলতে অপূর্বের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
অভাব-অনটনের মাঝেও পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছাশক্তি রয়েছে অপূর্ব ও তার বোনের। তারা দুজনেই ভালো ছাত্রছাত্রী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাদের প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অপূর্বের চোখে এখনও স্বপ্ন আছে কিন্তু সেই স্বপ্নের পথটা ভীষণ কঠিন। বাবার অনুপস্থিতিতে পরিবারটি আজ অসহায়। তবুও হাল ছাড়েনি তারা। সংগ্রাম আর আশা নিয়েই প্রতিটি দিন পার করছে এই ছোট্ট পরিবারটি।
এই পরিবারটির মতো অসংখ্য পরিবার সমাজের আড়ালে নীরবে লড়াই করে যাচ্ছে। একটু সহানুভূতি, একটু সহায়তা হয়তো বদলে দিতে পারে অপূর্বদের ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দিতে পারে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কিছুটা আলো।