একদিকে ঈদের আনন্দ আর অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম। তারপরও মানুষ ঈদের আনন্দ উদ্যাপনে মানুষ থেমে নেই। রংপুর অঞ্চলে ঈদের দিন থেকেই ভ্যাপসা গরম শুরু হয়েছে। ঝলমলে আকাশে রোদের ঝিলিক। তাপমাত্রা উঠানামা করছে। ছাতা ছাড়া বাহিরে বের হওয়াটা যেন অসহনীয়। এমন অসহ্য গরমেও থেমে নেই ঈদ আনন্দ। গরম উপেক্ষা করে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বেড়েছে মানুষের ভিড়। ছোট-বড় সববয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে রঙিন হয়ে উঠেছে দর্শনীয় স্থানগুলো। ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। সাথে বেরিয়েছে অভিভাবকরাও। সবমিলিয়ে গরমও হার মেনেছে ঈদ আনন্দে। ঈদুল আযহার উপলক্ষ্যে আজ ১ জুন সোমবারও রংপুর চিড়িয়াখানা, ভিন্নজগত, আনন্দনগর, চিকলি ওয়াটার পার্ক, নিসবেতগঞ্জ ঘাঘট নদী, টাউন হল চত্ত্বর, শতবর্ষী তিস্তা রেলওয়ে সেতু, মহিপুর তিস্তা সড়ক সেতু পয়েন্ট জুড়ে ছিল মানুষের ঢল। সব বয়সী মানুষের ঈদ উদযাপনের খোরাক যোগাচ্ছে এসব বিনোদন কেন্দ্র। দর্শনীয় স্থানগুলো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত নগরীর নিসবেতগঞ্জের ঘাঘট নদীর তীরে রক্ত গৌরব চত্ত্বর এলাকায় দেখা যায়, প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক ও ঘাঘট নদীর অংশ বিশেষসহ পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত নিচু এলাকায় সবুজের সাজানো কোলাহল মুক্ত পরিবেশে মানুষের ঢল নেমেছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর থেকে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে আসা শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার বলেন, অসহ্য গরমের মধ্যেও আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের আনন্দ আড্ডা থেমে নেই। সবাই মিলে খুব মজা করে বেড়াচ্ছি। চিড়িয়াখানায় জিরাফ, ভাল্লুক, সিংহ, হাতিসহ নতুন নতুন প্রাণি আনা দরকার। এখানে যদি আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ থাকত তাহলে প্রচুর দর্শনার্থী আসতো। আমরা চাই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে’ রংপুরে আনা হোক। রংপুর শিশুপার্কে মোনতাহা নামে এক অভিভাবক বলেন, পরিবারের ছোট্ট শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, গরমের কারণে গত দুদিন বের হতে পারিনি। গরম উপেক্ষা করে বাচ্চাদের সবাইকে নিয়ে এসেছি। বাচ্চারা টিভি চ্যানেল ও ফেসবুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিড়িয়াখানার খাঁচায় দেখেছে। ওরা ভেবেছে এখানে আছে। এখন ওরা চায় রংপুরেও ওই মহিষটাকে আনা হোক। নগরীর পূর্ব গুপ্তপাড়া থেকে ঘুরতে শিক্ষার্থী সায়ীদা ইয়াসমিন শিশুপার্কে ট্রেনের ছুটোছুটি, সেতুর নিচে রঙিন মাছ, মনোরম পরিবেশ আর ভূতের সংসার দেখে বেশ ভালো লেগেছে। তবে, এখানে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষটা থাকত তাহলে আমরা বেশি খুশি হতাম। রংপুর নগরী থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কাউনিয়া তিস্তা রেল সেতু। এটি জেলার শতবর্ষী একটি পুরাতন রেল সেতু। তিস্তা নদীর উপর নির্মিত এই রেলওয়ে সেতুর পাশে ২০১২ সালে তিস্তা সড়ক সেতু তৈরি করা হয়েছে। গোধূলীবেলার মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থী এখন এই তিস্তা নদীর তীরে আড্ডার আসর সাজিয়েছে। ঈদ উপলক্ষ্যে তিস্তা রেল সেতুর নিচ থেকে গোধূলীলগ্নের অপরূপ রূপের অবলোকন আর একটু স্বস্তির বিনোদন পেতে এখানে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষের আগানোগা বেড়েছে। একই চিত্র গঙ্গাচড়ার মহিপুর ঘাটে। তিস্তা নদীবেষ্টিত এই ঘাটে রংপুর-লালমনিরহাট জেলার মানুষের পারাপারে নির্মিত হয় তিস্তা সড়ক সেতু। এই সেতুর নিচে পানিতে ছুটে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট নৌকা। সেতুর আরেকপ্রান্তে বিশাল বালুচর। মনোরম পরিবেশে নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় উঠে ঘুরছে অনেকেই। আবার কেউ কেউ ধুধু বালুচরে প্রিয়জনের হাত ধরে হেঁটে হেঁটে গল্প করে সময় কাটাচ্ছে। এখানে বিকালে নদীর কোলে হেলে পড়া সূর্যের লুকোচুরি খেলা আকৃষ্ট করার মতো। ঈদের দিন থেকেই সেতুর ওপর মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মহিপুর ঘাটে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নগরীর খামার মোড় এলাকার এরশাদ হোসেন বলেন, ঈদের ছুটিতে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। শিশু-কিশোররা বেশ আনন্দ করছে। তিস্তা রেল সেতুতে দলবদ্ধভাবে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থীগণ বলেন, রংপুরে চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, ভিন্নজগত তারা বহুবার ঘুরে দেখেছেন। এসব বিনোদন স্পটে নতুন কিছু নেই। একারণে তিস্তা রেল সেতু পাড়ে এসেছেন। নদীর বুকে সূর্যের খেলা, শীতল বাতাস আর প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে সবাই একসঙ্গে বেড়িয়েছেন। ঈদের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার, দ্বিতীয় দিন শুক্রবার, তৃতীয় দিন শনিবার ও চতুর্থ দিন রবিবার রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার ছোট-বড় বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা ছিল। ঈদের পঞ্চম দিন সোমবারও বিভাগের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের পদচারণায় মুখরিত রয়েছে। একই চিত্র ছিল উন্মুক্ত দর্শনীয় স্থানগুলোতেও। এখন সব বয়সী মানুষের ঈদ উদযাপনের খোরাক যোগাচ্ছে বিনোদন কেন্দ্র ও পার্কগুলো। এবিষয়ে রংপুর চিড়িয়াখানার ইজারাদার হযরত আলী বলেন, ভ্যাপসা গরমের কারণে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি গত ঈদের চেয়ে অনেক কম। এবার তেমন চাপ নেই বরং দর্শনার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। চিড়িয়াখানায় নতুন নতুন প্রাণি আনার দাবি দর্শানার্থীদের। প্রসঙ্গত, দেশে দুটি সরকারি চিড়িয়াখানা রয়েছে তার মধ্যে একটি ঢাকার মিরপুরে আরেকটি রংপুরে। প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে নগরীর হনুমানতলা এলাকায় ১৯৮৯ সালে রংপুর চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি দর্শনার্থীদের জন্য ১৯৯২ সালে খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ২২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত চিড়িয়াখানাটিতে ৩১ প্রজাতির ২৪৯টি প্রাণি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিংহ, বাঘ, জলহস্তী, হরিণ, অজগর সাপ, ইমুপাখি, উটপাখি, ময়ূর, বানর, হনুমান, কেশওয়ারি, গাধা ও ঘোড়া।