May 1, 2026, 3:33 pm
শিরোনাম:
বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে জাতীয় স্বার্থের মরণফাঁদ মহান মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস  উপলক্ষে হাজী আব্দুস সাত্তার ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‍্যালি বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতুর দাবিতে গাইবান্ধায় মানববন্ধন, ঢাকার দূরত্ব কমবে ১৫০ কিমি নওগাঁয় ১৪ দফা দাবি ও গণমাধ্যম সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে সাংবাদিকদের শোভাযাত্রা টাঙ্গাইলে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস পালিত চৌগাছায় জমজ দুই কন্যাশিশুর পাশে “চৌগাছা পরিবার” মুন্সীগঞ্জে  প্রায় ১ কেটি ৫০ লক্ষ টাকা মূল্যের কষ্টি পাথরের মূর্তি’সহ ০২ জন’কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০ ইাউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস্ আ্যসোসিয়েশন (ঊষা) এর উদ্যোগে ১ম মে ২০২৬ বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত শ্রমিকদের ঘামেই গড়ে উঠবে উন্নত সরিষাবাড়ী-এমপি ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম কুলাউড়ায় পুলিশ সুপারকে ঘুষ দিতে গিয়ে নারীসহ আটক ২

বৈশ্বিক সারের সংকটে ন্যানো ইউরিয়া: মাঠে মিলছে আশার ইঙ্গিত

আল আমিন মিয়া নকলা (শেরপুর) :

বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কৃষি খাতের সম্পর্ক যে কতটা নিবিড়, সাম্প্রতিক সারের বাজারের অস্থিরতা তা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ইউরিয়া সারের বাজারে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক চাপ। কয়েক মাসের ব্যবধানে ইউরিয়ার মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শুধু কৃষি খাত নয়, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের খাদ্য উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি ধান, আর ধান উৎপাদন বহুলাংশে নির্ভর করে ইউরিয়া সারের ওপর। দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়ার চাহিদা থাকলেও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ১০ লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে বাকি বিপুল পরিমাণ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা দেশের কৃষিকে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে ফেলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা এবং জ্বালানি ঘাটতি সার আমদানির প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে। একই সঙ্গে সরকারকেও বাড়াতে হয় সারের ভর্তুকি, যা জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সারের জন্য প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়, যার সিংহভাগই ইউরিয়ায় ব্যয় হয়। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় কৃষিতে বিকল্প ও টেকসই সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সার—বিশেষ করে ন্যানো ইউরিয়া।

প্রচলিত ইউরিয়ার সীমাবদ্ধতা
প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া ব্যবহারের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর কম শোষণ দক্ষতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত ফসল প্রয়োগ করা ইউরিয়ার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নাইট্রোজেন শোষণ করতে পারে। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এই হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। বাকি অংশ ভোলাটিলাইজেশন, লিচিং এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপচয় হয়ে যায়।
এই অপচয়ের ফলে একদিকে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয়, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ে। নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) গ্যাস হিসেবে বায়ুমণ্ডলে নির্গত হওয়া নাইট্রোজেন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বড় হুমকি, কারণ এর তাপধারণ ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে মাটির জৈবগুণ কমে যায়, উপকারী অণুজীবের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং জলাশয়ে ইউট্রিফিকেশন সৃষ্টি হয়, যা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

ন্যানো ইউরিয়া: প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সার। ন্যানো ইউরিয়া মূলত অতি ক্ষুদ্র কণার তরল সার, যার কণার আকার ন্যানোমিটার পর্যায়ের হওয়ায় এটি গাছের পাতা, কাণ্ড ও শিকড়ের মাধ্যমে দ্রুত শোষিত হয়। উদ্ভিদের অভ্যন্তরে এটি ধীরে ধীরে ভেঙে অ্যামোনিয়াম ও নাইট্রেট আকারে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে, যা গাছের জন্য সহজলভ্য পুষ্টি হিসেবে কাজ করে।
এই নিয়ন্ত্রিত পুষ্টি নির্গমন প্রক্রিয়ার ফলে পুষ্টির অপচয় কমে যায় এবং শোষণ দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে প্রচলিত ইউরিয়ার কার্যকারিতা প্রায় অর্ধেক। ফলে একই ফলন পেতে কম পরিমাণ সার ব্যবহার সম্ভব হয়।

মাঠে বাস্তব অভিজ্ঞতা: নবীনগরের ট্রায়াল
বৈশ্বিক ও তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে, বাংলাদেশেও মাঠপর্যায়ে ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামে উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে একটি ট্রায়াল পরিচালিত হয়, যা ইতোমধ্যেই কৃষি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ন্যানো ইউরিয়ার স্যাম্পল পাওয়ার পর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিন নাইমের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় কৃষকের জমিতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়। পাশাপাশি দুটি জমিতে—একটিতে প্রচলিত ইউরিয়া এবং অন্যটিতে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করে তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করা হয়।
মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ধানের দানার গঠন, গাছের উচ্চতা এবং কার্যকর কুশির সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক পার্থক্য নেই। বরং ফলনের সম্ভাবনা ইতিবাচক। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে ন্যানো ইউরিয়া মাঠপর্যায়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
স্থানীয় কৃষক ফরিদা বেগম জানান, তিনি ব্রি-৯২ জাতের ধানে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিনবার ন্যানো ইউরিয়া স্প্রে করেছেন। তার অভিজ্ঞতায়, এই পদ্ধতিতে খরচ কম হয়েছে এবং ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্য কৃষকরাও জানিয়েছেন, ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম লাগছে এবং ফলন সন্তোষজনক হচ্ছে।

প্রয়োগ পদ্ধতি ও ব্যবহারিক দিক
ন্যানো ইউরিয়া প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। জমি প্রস্তুতের সময় মোট ইউরিয়ার ৫০ শতাংশ প্রয়োগ করা হয়। এরপর চারা রোপণের ২০, ৩৫ ও ৫৫ দিন পর তিন ধাপে ন্যানো ইউরিয়া স্প্রে করা হয়। প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলি ন্যানো ইউরিয়া মিশিয়ে প্রয়োগ করা হয় এবং প্রতি বিঘায় প্রতিবার প্রায় ১৩০ মিলি ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি ধানের ক্ষেত্রে তিনবার স্প্রে করতে মোট প্রায় ৫০০ মিলি ন্যানো ইউরিয়া প্রয়োজন হয়।
এই পদ্ধতিতে কম পরিমাণ সার ব্যবহার করেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
ন্যানো ইউরিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ব্যবহার করে প্রচলিত ইউরিয়ার ব্যবহার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে শুধু কৃষকের খরচই কমে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে ইউরিয়া আমদানির চাপও হ্রাস পায়।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আমদানি ব্যয় কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ খরচও কমানো সম্ভব, যা সামগ্রিকভাবে কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণও কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

পরিবেশগত গুরুত্ব
ন্যানো ইউরিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য। কম সার ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেনের অপচয় কমে, ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনও কম হয়। মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং জলাশয়ে দূষণের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে কৃষিতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক থেকে ন্যানো ইউরিয়া একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যদিও সম্ভাবনা সুস্পষ্ট, তবে বাংলাদেশে ন্যানো ইউরিয়ার বিস্তৃত ব্যবহার এখনও সীমিত। এর অন্যতম কারণ হলো পূর্ণাঙ্গ নীতিগত অনুমোদনের অভাব। ফলে এটি বাণিজ্যিকভাবে কৃষকের কাছে সহজলভ্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন, মাঠপর্যায়ে পাইলট প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রযুক্তিটি দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
এছাড়া সুষম সার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ন্যানো ইউরিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য ন্যানো সারের উন্নয়ন ও ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কৃষি খাত অতীতে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়েছে। এখন বৈশ্বিক সারের সংকট সেই অগ্রযাত্রায় নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। তবে এই সংকটই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
নবীনগরের একটি গ্রামের মাঠে যে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ইতিবাচক ফল দেখাচ্ছে, সেটি হয়তো ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের সূচনা। সঠিক নীতি সহায়তা, গবেষণা বিনিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যানো ইউরিয়া দেশের কৃষিতে একটি কৌশলগত সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয়ে টেকসই কৃষির পথে এগোতে হলে এখনই প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে পারে—ন্যানো প্রযুক্তি, বিশেষ করে ন্যানো ইউরিয়া।

বাংলা মার্কের জোনাল ম্যানেজার (সেলস্ অফিসার) মোঃ সানি মিয়া জানান, ন্যানো ইউরিয়া বাণিজ্যিক অনুমোদন পেলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে প্রচলিত ইউরিয়ার ব্যবহার কমবে, সরকারের ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে এবং কৃষকরা স্বল্প মূল্যে কার্যকর সার পাবেন। তিনি বলেন, ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে উৎপাদন খরচ কমবে, ফলন বাড়বে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।