মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর ইউনিয়নের উত্তর বাখরের কান্দি এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় নারী হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুততম সময়ে উদঘাটন করেছে পুলিশ ও র্যাব-৮। হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ফারুককে গ্রেফতারের পাশাপাশি নিহত নারী শাম্পা খাতুনের ব্যবহৃত স্বর্ণের নাকফুল, রূপার চেইন, জুতা ও আংশিক পোড়ানো ওড়নাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ফারুক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে সে শাম্পার এক বছর বয়সী শিশু সন্তান আবিরকে আড়িয়াল খাঁ সেতু থেকে নদীতে ফেলে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। নিখোঁজ শিশুটির মরদেহ উদ্ধারে নদীতে ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বাখরের কান্দি গ্রামের খানবাড়ির মাদ্রাসার বিপরীতে ঝোপের মধ্য থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে শিবচর থানা পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং নিহতের পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়।
পরে খবর পেয়ে নিহত নারীর বাবা নাটোর জেলার লালপুর থানার ছামরুল ইসলাম শিবচর থানায় এসে মরদেহটি তার বড় মেয়ে শাম্পা খাতুনের (২০) বলে শনাক্ত করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে শাম্পা খাতুনের সঙ্গে মাদারীপুর সদর উপজেলার বড় মেহের এলাকার শাহাবুদ্দিন হাওলাদারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক বছর বয়সী আবির নামে একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
শাম্পার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তার সঙ্গে থাকা এক বছর বয়সী শিশু আবিরও নিখোঁজ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। পরে এ ঘটনায় নিহতের বাবা ছামরুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০ আগস্ট শিবচর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। মাদারীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের নির্দেশনায় এবং শিবচর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন কাদেরের নেতৃত্বে শিবচর থানা পুলিশ ও র্যাব-৮ যৌথভাবে অভিযান শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজন ফারুকের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একই অভিযানে তার হেফাজত থেকে নিহত শাম্পার ব্যবহৃত স্বর্ণের নাকফুল, রূপার চেইন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার বাসার চুলা থেকে আংশিক পোড়ানো একটি ওড়নাও উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফারুক শাম্পাকে হত্যার পর তার এক বছর বয়সী শিশু সন্তান আবিরকে আড়িয়াল খাঁ সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এরপর থেকেই নিখোঁজ শিশুটির সন্ধানে নদীতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের সদস্যরা আড়িয়াল খাঁ নদীতে শিশুটির মরদেহ উদ্ধারে তৎপর রয়েছেন। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে শিশু আবিরের মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে তার পরিবার।
শিবচর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কাদের বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ ও র্যাব-৮ যৌথভাবে কাজ করেছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ শিশুটির মরদেহ উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও বলেন, জেলাজুড়ে হত্যা, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর অবস্থান এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মামলার তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ, জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদের ভূমিকা এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।