June 5, 2026, 8:32 pm
শিরোনাম:
নাচোলে বজ্রপাতে ২ জনের মৃত্যু  নরসিংদী মাধবদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ, একজন গ্রেপ্তার ঘেরাবেড়া দিতে গিয়ে সংঘর্ষ, পাইকগাছায় আহত-৪ ফরিদপুরে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১ জ্যৈষ্ঠের ফলের ঘ্রাণে জমে উঠল মৌচাকের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক মিলনমেলা প্রকৃতিই আমাদের ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক: বিশ্ব পরিবেশ দিবসে গাকৃবি ভিসি গাইবান্ধার ঘাঘট লেক জুড়ে কচুরিপানার সবুজ গালিচা ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে জমি চাষ দিতে গিয়ে ট্রাক্টর উল্টে পদ্মা নদীতে ডুবে চালকের মৃত্যু পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় পৃথক স্থানে বজ্রাঘাতে দুই কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঐতিহ্যবাহি হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন বাজারে আসছে

ঐতিহ্যবাহি হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন বাজারে আসছে

এস,এম শাহাদৎ হোসাইন, রংপুর

জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রংপুরের ঐতিহ্যবাহি হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন থেকে বাজারে আসতে শুরু হবে। দেশে উৎপাদিত একমাত্র আঁশবিহিন সুস্বাদু ফল দেশে উৎপাদিত সব আমের সেরা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এবারেও আম পুষ্ট হবার আগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে ২৫ কোটি টাকারও বেশি আমের রপ্তানি অর্ডার পেয়েছে বাগান মালিকরা। তবে এবার বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে ফলন কম হবার আশঙ্কা করছেন আমচাষিরা। তারা বলেন, এবারের বৈরী আবহাওয়া, বৃষ্টি, ঝড়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ফলন ভালো হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ২শ হেক্টর বেশি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরেও ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। যাতে অন্তত ২শত কোটি টাকার আম তারা বিক্রি করতে পারবেন। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাঁড়িভাঙ্গা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে বেশি সময় লাগে। ফলে আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের আকার অন্যান্য বারের চেয়ে কাঙ্খিত হয়েছে। ন্যায্য মূল্য পেলে আমচাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া অন্যান্য বারের চেয়ে এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাহিদা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশি হবে বলে আশা করছেন আম ব্যবসায়ীরা। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লালমাটি বলে পরিচিত পদাগঞ্জ এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আম প্রথম উৎপাদন করেন সালাম নামে এক চাষি। স¤পূর্ণ আঁশমুক্ত আর দারুণ সুস্বাদু হওয়ায় আমটির চাহিদা এখন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকার আম রপ্তানি করছে চাষিরা। বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, পদাগঞ্জ, কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট সর্দ্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করণী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি,মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই এখন গড়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাণিজ্যিক বাগান। মূলত, লালমাটি এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আমের যেমন ভালো ফলন হয়, তেমনি অনেক বেশি সুস্বাদুও। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠেছে। আমচাষিরা বলেন, বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে। ক্ষুদ্র চাষিদের অভিযোগ, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন। আমচাষিদের অভিযোগ,বড় বড় ব্যবসায়ী আগাম টাকা দিয়ে আমের বাগান ক্রয় করার করণে তারা লাভবান হচ্ছে বেশি। হাঁড়িভাঙ্গা আম বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তত ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষ করে হাজার হাজার পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকায় দেখা যায়, সারি সারি বাগান ছাড়াও প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ১০-১৫টি হাঁড়িভাঙ্গা আমের গাছ। আবার কোনো কোনো বাড়ি ঘিরে শুধুই আমগাছ। আম পাকা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একই এলাকার আমচাষি মনোয়ার হোসেন, রহমত আলী, আয়েশা বেগমসহ অনেকেই বলেন, ১০ বছর আগেও এসব এলাকা ছিলো অভাবী মানুষে ভরা। এখন সেই অভাব আর নেই। সচ্ছলতা এসেছে ঘরে ঘরে। এক সময় তিন বেলা তো দূরের কথা এক বেলা খাবারও জুটতো না। লাল মাটি হওয়ায় বছরে একবার মাত্র ধান উৎপাদন হতো। বাকি ৮ মাস পতিত পড়ে থাকতো। তবে হাঁড়িভাঙ্গা আম এসে তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন এক ফসলি ধানের জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক আম বাগান। বছরে আম বিক্রি করে সবার সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের বাস্তুভিটাতেই হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছ লাগিয়ে উৎপাদিত আম বিক্রি করে সচ্ছলতা এনেছেন। তবে চাষিদের দাবি একটাই, আম সংরক্ষণে ব্যবস্থা করা। আম সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় পানির দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ ব্যাপারে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করছেন চাষিরা। হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান মালিক রমজান আলী বলেন, ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন আড়তদার এবার অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করছেন। তার মতো আরও অন্তত ৪০টি বাগান মালিকদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আপাতত ২০ কোটি টাকার আমের অর্ডার মিলেছে। তবে রপ্তানি এবার ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা চাষিদের। রংপুর জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম ক্রয় করতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারিও বাড়ানো হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রিয় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো পদাগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অফিস স্থাপন করেছে। তারা বাগান থেকে আম সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা রেখেছে। জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, কৃষিবিভাগসহ সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে আগামী ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিক্রি করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, এবার অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও তা অস্বাভাবিক নয়। এতে তেমন কোন ক্ষতি হবে না। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিপণন বিভাগের উপ-পরিচালক সিফাত জাহান বলেন, হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরের ঐতিহ্যকে আরও বেশি করে দেশে বিদেশে পরিচিত করেছে। এবার আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে ফলন একটু কম হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। আশা করা যায়, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩০ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবার চাষিরা লাভবান হবে বলে আশা করা যায়।