দিনখন গণনা শুরু হয়েছে। আর মাত্র চার দিন বাকী। দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আযহা। এরমধ্যে রংপুর বিভাগে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠেছে। হাটে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে। তবে হাটে ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় হতাশ খামারি ও ব্যবসায়ীরা। বৈরী আবহাওয়া, দালালচক্রের উৎপাত, অতিরিক্ত হাসিল আদায় ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার পশুর বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। রংপুর জেলার অন্যতম বৃহৎ পশুরহাট গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি হাটে দেখা যায়, দেশি, শংকর ও বিদেশি জাতের গরু-ছাগলে ভরে গেছে পুরো হাট। বিক্রেতারা সারি সারি খুঁটিতে পশু বেঁধে রেখেছেন। ক্রেতাদের ভিড়ও কম নয়। কিন্তু দাম শুনে অধিকাংশ ক্রেতাই ফিরে যাচ্ছে। ফলে হাট জমজমাট হলেও বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে কম। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের চলাচলেও দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। তবুও ছোট-বড় নানা জাতের গরু-ছাগল নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন। জাত ও আকারভেদে গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ছাগল বিক্রি হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়। আজ ২৪ মে রবিবার সকালে রংপুর নগরীর লালবাগ পশুর হাটে খামারিরা বলেন বেচাকেনা অনেকটা কম। পবিত্র ঈদুল আযহা যত ঘনিয়ে আসছে ততই জমতে শুরু করছে পশুর হাট। আফিল উদ্দিন নামে এক গরু বিক্রেতা বলেন, মানুষ অনেক, কিন্তু বিক্রি নেই। সবাই শুধু গরু দেখে আর দাম শুনে চলে যায়। বিক্রির জন্য আনা আট মণ ওজনের একটি বিদেশি জাতের গরুর দাম তিনি হাঁকছেন তিন লক্ষ টাকা। নীলফামারীর জলঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল সামাদ বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি অনেক কম। হাটে গরু প্রচুর, ক্রেতাও আছে, কিন্তু কেনাবেচা কম হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ৪৮০ টাকা কেজি লাইভ ওয়েটে গরু বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার গরু-ছাগলের দাম কিছুটা বেশি বলে মনে করছেন অনেক ক্রেতা। আবার কেউ কেউ বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী পশুর দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। মাঝারি আকারের দেশি গরুর চাহিদা অনেক বেশি। খলেয়া এলাকা থেকে আসা ক্রেতা আব্দুস সোবহান এক লক্ষ ১০ হাজার টাকায় একটি দেশি ষাঁড় ক্রয় করেছেন। তিনি বলেন, ঈদের আগে হাটে ভিড় বাড়বে। ফলে আগে ভাগে গরু ক্রয় করলাম। গোখাদ্যের দাম বাড়ার কারণে গরুর দামও বেড়েছে। রংপুর নগরীর নিসবেতগঞ্জ, পাওটানা ও সদর উপজেলার পালিচড়া হাটেও একই চিত্র দেখা গেছে। হাটে লোকসমাগম থাকলেও বিক্রি তুলনামূলক কম। অনেকে এখনো শুধু দাম যাচাই করছেন। অনেক ক্রেতা আবার শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন, কারণ ঈদের দু-তিন দিন আগে দাম কমতে পারে বলে তাদের ধারণা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, এখন অনেক অবস্থাপন্ন মানুষ সরাসরি খামার থেকে গরু ক্রয় করছেন। হাটে ঝামেলা, দালাল ও অতিরিক্ত খরচ এড়াতে তারা খামারমুখী হচ্ছে। অন্যদিকে হাটে দূরদূরান্তের পাইকারদের উপস্থিতিও আগের তুলনায় কমে গেছে। ঢাকা থেকে গরু ক্রয় করতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, ইজারাদারের লোকজনের অতিরিক্ত হাসিল আদায়, দালালদের উৎপাত এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক পাইকার এবার হাটমুখী হচ্ছে না। বেতগাড়ি হাটে গরু ক্রয় করতে আসা শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বলেন, দালাল ছাড়া হাটে গরু ক্রয় করার সুযোগ নেই। নিজেরা দরদাম করলেও নানা কৌশলে টাকা আদায় করা হয়। পালিচড়া হাটের ইজারাদার রেজাউল করিম বলেন, সবকিছু রশিদে উল্লেখ থাকে। গরুর জন্য ৭০০ টাকা লেখা ও ২০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ, জাল নোট শনাক্তকারী টিম ও স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে। রংপুরের পশুর হাটের মধ্যে লালবাগ, বুড়িরহাট, তারাগঞ্জ হাট, পাগলাপীর হাট, বড়াইবাড়ি হাট, চৌধুরানী হাট, দেউতি হাট, নজিরের হাট, পাওটানা হাট, কান্দির হাট, সৈয়দপুর হাট, মিঠাপুকুর বৈরাতি হাট, জায়গীর হাট, শঠিবাড়ি হাট, বালুয়া হাট, মাদারগঞ্জ হাট, ভেন্ডাবাড়ি হাট উল্লেখযোগ্য। রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ হাজার ৩০৩টি স্থায়ী হাট রয়েছে। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এবার রংপুর বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ১৪ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭টি। চাহিদার বিপরীতে পশু প্রস্তুত রয়েছে ২০ লক্ষ ২৩ হাজার ৬৭টি। উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা ৫ লক্ষ ৫৬ হাজার ৪১০টি। বিভাগের আট জেলায় ছোট-বড় মিলে প্রায় ২১ হাজার খামার রয়েছে। এর মধ্যে শুধু রংপুর জেলাতেই নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এবারে জেলাভিত্তিক কোরবানির পশুর হিসাব রংপুরে প্রস্তুত পশু ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৫৯১, চাহিদা ২ লক্ষ ২৬ হাজার ৯৯৯, গাইবান্ধায় পশু ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯০০, চাহিদা ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০০, কুড়িগ্রামে পশু ৩ লক্ষ ৩৬ হাজার ৯১৯, চাহিদা ২ লক্ষ ৬১ হাজার ২৪৬, নীলফামারীতে পশু ২ লক্ষ ৮২ হাজার ৮৫০, চাহিদা ২ লক্ষ ৩২ হাজার ৬৭৬, লালমনিরহাটে পশু ২ লক্ষ ৬ হাজার ৪৬২, চাহিদা ১ লক্ষ ৫২ হাজার ৮৮৪, দিনাজপুরে পশু ৪ লক্ষ ২৬ হাজার ৫২৩, চাহিদা ২ লক্ষ ৭৩ হাজার ২৬২, ঠাকুরগাঁওয়ে পশু ৯৫ হাজার ৪৩৬, চাহিদা ৭৮ হাজার ৮৪৩ এবং পঞ্চগড়ে পশু ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৩০৩, চাহিদা ১ লক্ষ ৩ হাজার ৬৫০ পশু। বিভাগজুড়ে প্রায় ২১ হাজার খামারে কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। শুধু রংপুর জেলাতেই নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা প্রায় চার হাজার রয়েছে। খামারিরা বলেন, ভারতীয় গরু না এলে তারা লাভবান হবেন। তবে সীমান্ত দিয়ে গরু প্রবেশ করলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। রংপুর ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লতিফুর রহমান মিলন বলেন, পশুখাদ্যসহ সব ধরনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। মাংসের কেজি ৭০০ টাকার নিচে বিক্রি হলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার বলেন, রংপুর অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে সাড়ে পাঁচ লক্ষাধিক পশু। এসব পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো যাবে। এবার কোরবানির ঈদে পশু বিক্রির মাধ্যমে রংপুর বিভাগের অর্থনীতিতে যোগ হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।