June 15, 2026, 5:55 am
শিরোনাম:
নিখোঁজ মুক বধিরের খোঁজে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে উস্তি থানার এসআই পার্থ সাহা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্যে অভিনন্দন দেশবন্ধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ সিরাজগঞ্জে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেলেন এমপি আমির হামজা! গাজীপুরে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন ফেসবুকে অপপ্রচারের ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি প্রদান বহিরাগত প্রো-ভিসি নিয়োগ প্রত্যাখ্যান: গাকৃবিতে শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন, প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ শরীয়তপুরের চন্দ্রপুরের কীর্ত্তীনগর যুব সমাজ কল্যাণ সংগঠন অসহায় প্রতিবন্ধী কুলসুমকে ঘর উপহার দিল: আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কুলসুমের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ টাঙ্গাইলে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত মায়ের মরদেহ আটক করে ছেলেকে কান ধরে উঠবস

সুলতানি ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী মসজিদকুড় মসজিদ

শাহরিয়ার কবির,খুলনা

খুলনার উপকূলঘেঁষা জনপদ কয়রার মসজিদকুড় গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর সাক্ষী এক ঐতিহাসিক স্থাপনা— মসজিদকুড় মসজিদ। বাংলার সুলতানি আমলে (১৩’শ থেকে ১৬’শ শতক) স্থাপত্যেধরার স্মারক হিসেবে এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ইতিহাস, সাংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নে অবস্থিত মসজিদটি। ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদের ঠিক পূর্ব পারে মসজিদটির অবস্থান। সুলতানি আমলে নির্মিত মসজিদটি কালক্রমে অনেকবার সংস্কার করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন মসজিদকুঁড় এখন সরকারের তত্ত্বাবধানে সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৪৫০-১৪৯০ সালে খানজাহান আলীর (রহ.) শিষ্য বুড়া খান ও ফতেহ খান আমাদি গ্রামে কাছারি স্থাপন করে শাসন করতেন। সে সময়ে তারা মসজিদকুঁড় নির্মাণ করেন। মসজিদটি প্রায় ৪৫ একর জায়গার ওপর নির্মিত। ইট-সুরকির মসজিদটি দক্ষিণবাংলার সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা।

মসজিদের দক্ষিণ দিকে বুড়া খান ও ফতেহ খানের কাছারিবাড়ি ও সমাধি ছিল। তা বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলীন হয়ে গেছে। মূল মসজিদও একসময় তলিয়ে গিয়েছিল। আশপাশের সমস্ত এলাকা জঙ্গল হয়ে গিয়েছিল। মানুষ মসজিদে যেতে সাহস করতো না। পরে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিপুল সংস্কার করে মসজিদটি উদ্ধার করা হয়।

মসজিদকুঁড় ঘুরে দেখা যায়, বর্গাকার মসজিদের প্রতি পাশের মাপ হচ্ছে ১৬ দশমিক ৭৬ মিটার এবং ভেতরের মাপ ১২ দশমিক ১৯ মিটার। কেবলামুখী দেওয়াল বাদে বাকি তিন দেওয়ালে মসজিদে ঢোকার জন্য তিনটি করে প্রবেশদ্বার। মাঝের প্রবেশদ্বারগুলো অপেক্ষাকৃত বড়। কেবলামুখি দেওয়ালে অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব। মসজিদের ভেতরে চারটি স্তম্ভের ওপর ছাদ ভর করে আছে। চারটি স্তম্ভ মসজিদের ভেতরের অংশকে নয়টি সমবর্গক্ষেত্রে ভাগ করেছে। বর্গক্ষেত্রগুলো গম্বুজ দিয়ে ঢাকা। মসজিদটি একসময় টেরাকোটা দিয়ে সজ্জিত ছিল। তবে টেরাকোটার অনেক অংশ খসে পড়েছে।

আমাদি ইউনিয়নের বাসিন্দা সেরতাজ গাজী ইতিহাসের অংশ তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ এ অঞ্চলে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাতশ বছর পূর্বে এসে বসবাস শুরু করেন। সম্রাট ফরিদ খাঁর আমলে হযরত খান জাহান আলী (রহ.) যশোর বারো বাজার এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলেন। তখন খান জাহান আলী (রহ.) দক্ষিণাঞ্চলে পাড়ি দিলে তার দুই শিষ্য বুড়া খান ও তার ছেলে ফতেহ খান এ অঞ্চলে এসে মসজিদকুঁড় নির্মাণ করেন এবং ধর্ম প্রচার শুরু করেন।’

তিনি বলেন, ‘তাদের সমাধি এখানেই ছিল। কিন্তু বিভিন্ন দুর্যোগ ও বন্যায় সমাধি বিলীন হয়ে গেছে। মসজিদে অনেক পোড়ামাটির কাজ ছিল। তা খসে গেছে। ইট-সুরকি দিয়ে নির্মিত মসজিদ অনেক মজবুত। তবে এখন সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কার প্রয়োজন।’

আমাদি ইউনিয়নের বাসিন্দা এখলাস উদ্দিন বলেন, ‘মসজিদের ভেতরে একবারে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারবেন। তবে শুক্রবার দিন ৫০০-৬০০ মুসল্লি হয়। তখন মসজিদের বাইরে নামাজ আদায় করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘মসজিদকুঁড় ২০২৩ সালের জুন-জুলাই মাসে সংস্কার করা হয়। গ্রামবাসীর অর্থ, ইউনিয়ন পরিষদের ফান্ড এবং সরকারি ব্যয় মিলিয়ে মোট প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার টাকার সংস্কার করা হয়। মসজিদের আরও সংস্কার প্রয়োজন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রত্যেক মসজিদে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও আমাদের মসজিদে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আমাদের মসজিদে প্রয়োজন।’

মসজিদকুঁড় গ্রামের বাসিন্দা ও মসজিদকুঁড়ের সহ-সভাপতি আইয়ুব হোসেন সানা বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখতাম মসজিদে ওয়াক্তের নামাজে কম মুসল্লি হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লোকজনের বসবাস বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন অনেক মুসল্লি হয়। শুক্রবার দিন নামাজ পড়তে বেশি লোকজন আসেন।’

তিনি বলেন, ‘এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদের আরও সংস্কার প্রয়োজন। মসজিদটি দেখাশোনার জন্য দীর্ঘদিন কোনো লোক নেই। আমাদের এই গরিব এলাকায় মসজিদে একজন ইমাম রাখার খরচ বহন করার মতো সামর্থ নেই। সরকারিভাবে ইমাম রাখার কথা শুনেছিলাম। সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ সংস্কার এবং উন্নয়ন খুব প্রয়োজন।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘এখানে আগে মাদ্রাসা ছিল না। এখন আশপাশে প্রায় ৪-৫টি মাদ্রাসা আছে। মাদ্রাসার ছাত্ররা এ মসজিদে নামাজ পড়েন। মানুষের আগমন এলাকায় বেড়েছে। সেজন্য সরকার একটু নেক নজর দিলে মসজিদের উন্নয়ন সম্ভব। আমরা এলাকাবাসী অনেক খুশি হবো।’