জমালপুর এক সময়ের খরস্রোতা বানিয়াবাজার খাল এখন মৃতপ্রায়। দখল, দূষণ আর অপরিকল্পিত নগরায়নের থাবায় জামালপুর শহরের পানি নিষ্কাশনের এই প্রধান ধমনীটি আজ সংকীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক ধারণা পত্রে খালের এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
সম্প্রতি খালের করুণ দশা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিভাগীয় সমন্বয়কারী ঢাকা ও ময়মনসিংহ (বেলা) গৌতম চন্দ্র, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোঃ এনামুল হক, ট্যুরিজম নিউজ এজেন্সির নির্বাহী সম্পাদক মোঃ শফিকুল ইসলাম আজাদ খান, জাতীয় দৈনিক সোনালী কণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার মোঃ এমদাদুল হক এবং জাতীয় দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রার স্টাফ রিপোর্টার মোঃ সেলিম উদ্দিনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অংশ এই খালটি জামালপুর শহরের পূর্ব পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবহমান। ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী ‘বানার’ নদীর উৎসমুখ থেকে উৎপন্ন হয়ে কুইরা বিল ও লুইচগেট হয়ে এটি ঝিনাই নদীতে পতিত হয়েছে। এক সময় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি বর্তমানে দখল ও ভরাটের কারণে সংকুচিত হয়ে মাত্র ২ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে।
সরেজমিনে এবং বেলা’র প্রতিবেদনে খালের বিপন্ন অবস্থার কয়েকটি ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে:- অবৈধ স্থাপনা: খালের পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাড়িঘর, দোকানপাট এবং বহুতল ভবন – সংকুচিত প্রবাহ: খালের উৎসমুখে ২০ মিটার প্রশস্ততা থাকলেও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে তা মাত্র ১০ মিটারে দাঁড়িয়েছে।- অপরিকল্পিত সেতু: মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে ২০টিরও অধিক ছোট-বড় সেতু ও সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।-বর্জ্যের ভাগাড়: বর্তমানে খালটি পৌর বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, বানিয়াবাজার খাল জামালপুর পৌরসভার ৫, ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে এই বিশাল এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেলার ধারণা পত্রে সতর্ক করে বলা হয়েছে—
”প্রাকৃতিক এই জলাধারকে বাঁচাতে না পারলে ভবিষ্যতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থা করেও শহরকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করা সম্ভব হবে না।”
১৯৮৮ সালের বন্যার পর স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে এখানে সুইচগেট লাগানো হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা এখন অকার্যকর। খালের সীমানা নির্ধারণ বা গাইড পিলার না থাকায় দখলদাররা প্রতিদিন খালের জমি গ্রাস করছে। সচেতন মহলের দাবি, জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবিলম্বে:১)খালের সঠিক সীমানা নির্ধারণ ও সংস্কার করতে হবে।২)সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।৩)বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে খালের প্রবাহ সচল করতে হবে।
বানিয়াবাজার খাল শুধু একটি জলধারা নয়, এটি জামালপুর শহরের ফুসফুস। এই ঐতিহ্যবাহী খালটি উদ্ধার করা না গেলে শহরবাসী এক দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই মৃতপ্রায় খালকে পুনর্জীবন দিতে।