July 29, 2026, 4:49 pm
শিরোনাম:
গঙ্গাচড়ায় গর্তে রাস্তার বেহাল অবস্থা, দ্রুত সংস্কারের দাবি গাইবান্ধায় আড়াই বছর ধরে আটকে রয়েছে ৭টি সেতুর কাজ, ৪টি সেতুর কাজ শুরু হয়নি রামগতিতে পানির লাইন খুঁড়তে মিলল তিনটি মর্টার শেল সদৃশ বস্তু নীলফামারীতে র‍্যাব-১৩ এর উদ্যোগে মাদক ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সুধী ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত দিনাজপুর পৌরসভার সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ে “নাগরিক ভাবনাঃ আমাদের করণীয়” শীর্ষক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের নবনিযুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আকরাম এলাহী মাদকবিরোধী অভিযানে কৃতিত্বের স্বীকৃতি, সম্মানিত রাঙ্গামাটি পুলিশের এসআই মহিউদ্দিন আলমগীর শরীয়তপুরে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ আটক ৩ জাপানে ভূমিকম্পে নিহত অন্তত ১৩, চলছে উদ্ধার অভিযান জেন জি’রা আসছে, সাবধান ভারত

তিস্তা মহাপরিকল্পনা হোক উত্তরের আলোর প্রদীপ –

এম আলমগীর কবির

উত্তর অঞ্চলের কৃষি আজ বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। নদীর পানি কমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, খরা, লবণাক্ততা, কৃষিজমি হ্রাস, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থায় কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে উত্তর অঞ্চলের কৃষক সমাজ এক কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন” কেবল নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, পানি ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনার একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন।
বাংলাদেশের সংবিধানও এই নতুন কৃষি দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে জনগণের মালিকানার বিভিন্ন রূপের মধ্যে সমবায় মালিকানাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান কেবল ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলে না; বরং সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নকেও রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কৃষি, বীজ, খাদ্য বাজার, শস্য সংগ্রহ, এমনকি পানি ব্যবস্থাপনাতেও কর্পোরেট স্বার্থের প্রভাব বাড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কৃষক ধীরে ধীরে স্বাধীন উৎপাদক থেকে নির্ভরশীল ভোক্তায় পরিণত হচ্ছে। কৃষক তার বীজ, সার, কীটনাশক ও বাজার—সব ক্ষেত্রেই কর্পোরেট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষির প্রকৃত লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে, আর কৃষক আটকে যাচ্ছে ঋণ, অনিশ্চয়তা ও বাজার বৈষম্যের চক্রে।
এই বাস্তবতায় সমবায়ভিত্তিক কৃষি কেবল অর্থনৈতিক বিকল্প নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, কৃষকের আত্মমর্যাদা এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্গঠনের একটি পথ। পৃথিবীর বহু দেশ কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সমবায় ব্যবস্থাকে সফলভাবে ব্যবহার করেছে।
চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি সংস্কারের ইতিহাসে গ্রামীণ সমবায়, যৌথ সেচব্যবস্থা, স্থানীয় উৎপাদন সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তীতে চীন বাজার অর্থনীতির কিছু উপাদান গ্রহণ করলেও কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামোয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সমবায় কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দেয়নি। ফলে তারা কৃষিকে শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।
ভিয়েতনামও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে এসে সমবায়ভিত্তিক কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আজ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক রাষ্ট্র। কৃষক সংগঠন, সেচব্যবস্থা, গ্রামীণ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার সমন্বিত নীতির কারণেই তারা এই সফলতা অর্জন করেছে।
এছাড়া নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক এবং ভারতের কিছু অঞ্চলেও কৃষি সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতের “আমুল” সমবায় মডেল দেখিয়েছে, কীভাবে ক্ষুদ্র খামারি ও দুগ্ধ উৎপাদকদের সংগঠিত করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়।
বাংলাদেশেও এই ধরনের সমবায়ভিত্তিক কৃষি আন্দোলনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। তিস্তা অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ,ও সেচব্যবস্থা, ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিকল্পিতভাবে তিস্তার ২৫ টি শাখা নিদিকে জলাভূমি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে কৃষক সমবায়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
নয়া কৃষির ধারণা কেবল জমিতে ফসল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি পানি, নদী, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় শিল্পের সমন্বিত অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রশ্ন। সমবায়ভিত্তিক প্যাডি সাইলো নির্মাণ, পোল্ট্রি, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন ও দুগ্ধখামার গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সমবায় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় উন্নয়নের বিকেন্দ্রীভূত মডেল গড়ে তোলা সম্ভব।
আজকের কর্পোরেট পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা কৃষিকে ধীরে ধীরে বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যেতে চায়। কৃষক যেন নিজের জমির মালিক হয়েও উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে—সেই লড়াই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন কৃষি আন্দোলনের প্রতীক হতে পারে; যেখানে নদী থাকবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে, কৃষক হবে অর্থনীতির মূল শক্তি এবং সমবায় হবে উৎপাদন ও বণ্টনের প্রধান ভিত্তি।
বাংলাদেশের বিদ্যমান কৃষিনীতি পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ বর্তমান নীতিতে কৃষক, নদী ও গ্রামীণ অর্থনীতির চেয়ে কর্পোরেট বাজার ব্যবস্থাকেই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতি ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের কথা স্পষ্টভাবে বলা হলেও বাস্তবে সেই চেতনা অনেকাংশে উপেক্ষিত।
আজ সবাই সংবিধানের কথা বললেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে সমবায়, কৃষকের মালিকানা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত। এর পরিবর্তে কর্পোরেট পুঁজির বিস্তারকে সহজ করতে কৃষি, খাদ্য ও বাজারব্যবস্থাকে ক্রমেই বহুজাতিক ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি তিস্তায় নতুন করে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কে জমি লিজ দেয়া হচ্ছে যা সাধারণ কৃষকদের মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উত্তর অঞ্চলের মানুষের কৃষি ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।
অপরপক্ষে ,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসম কৃষি বাণিজ্য চুক্তি দেশীয় কৃষককে প্রতিযোগিতাহীন অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে। এতে বিদেশি কৃষিপণ্যের অবাধ প্রবেশ বাড়বে, কিন্তু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ন্যায্যমূল্য ও বাজার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
এই বাস্তবতায় “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কেবল নদী বা কৃষির প্রশ্ন নয়; এটি সংবিধানের মূল চেতনা—সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জ্বলন্ত উদাহরণ ।
তাই প্রয়োজন কৃষককেন্দ্রিক নতুন কৃষিনীতি, যেখানে নদী ও পানিসম্পদ রক্ষা, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, স্থানীয় বাজার সুরক্ষা এবং কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে সাজানো ছাড়া বাংলাদেশের সামনে টেকসই উন্নয়নের আর কোনো বিকল্প নেই। সেই কারণেই জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা”কে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কেবল উত্তরাঞ্চলের সেচ, নদী পুনরুদ্ধার ও কৃষি অর্থনীতিই শক্তিশালী হবে না; বরং এর অভিজ্ঞতা ধাপে ধাপে পদ্মা অববাহিকা, ভবদহ, হাওর, চলন বিলসহ দেশের অন্যান্য জলাভূমি ও নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলেও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
কেন এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সময়ের দাবি? চলেন দেখি আসি কি আছে এই মহাপরিকল্পনায় –
উত্তর অঞ্চলের দুই কোটি মানুষের কষ্ট দূর হবে যদি এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এই পরিকল্পনায় দুই পাড়ে বাঁধ নির্মাণ ও কানেকটিং নদী গুলোকে জলাধার হিসেবে ব্যবহার করা হবে যার ফলে তিস্তা পারের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। পাশাপাশি নদীটি যখন দশ মিটার খনন করা হবে বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে উত্তর অঞ্চল। এটি বাস্তবায়ন হলে ১৭০ কিলোমিটার জমি উদ্ধার হবে যার আনুমানিক মূল্য ২০ হাজার কোটি টাকা যার মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের কৃষি ও জীবিকা সমৃদ্ধ হবে। একই সাথে রয়েছে তিনটি নৌ বন্দর ও টার্মিনালের কথা যার দ্বারা সরাসরি নৌ পথে রাজধানীর সাথে যোগযোগ সহজ ও সময় অপচয় কমে যাবে। এখানে রয়েছে একটি সৌর বিদ্যুৎ নগরায়ন, কৃষি ভিত্তিক শিল্পায়ন, বনায়ন, সবুজায়ন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা। সর্বোপরি, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তর অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্ম সংস্থান তৈরি হবে এবং এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে এই তিস্তা।
অতএব, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা ” কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্পের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৃষি-অর্থনীতির নতুন রূপরেখা। যেখানে জলবায়ু অভিযোজন, নদীভিত্তিক পরিকল্পনা, সমবায় অর্থনীতি এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার মিলেই গড়ে উঠবে একটি মানবিক, স্বনির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ।

লেখক: এম আলমগীর কবির,কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *