October 8, 2026, 11:26 pm

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন নেতানিয়াহু, জানালেন নিজেই

নিউজ পাওয়ার ২৪ ডেস্ক:

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবার ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। এ তথ্য তিনি নিজেই জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, এই সমর্থনের পেছনে ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি নন, বরং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্কই মূল কারণ।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের পর রেফারিং নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যেই প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানান নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, চলতি বিশ্বকাপে তার সমর্থন আর্জেন্টিনার প্রতি। উপস্থাপক মন্তব্য করেন, সম্ভবত লিওনেল মেসির কারণেই তিনি আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘না। মেসির আগে প্রেসিডেন্ট মিলেই।’

এ সময় তিনি মিলেইর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘তিনি একজন সত্যিকারের সুপারস্টার। তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু।’ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্য আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের প্রতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সমর্থনেরই প্রতিফলন।

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী রাজনীতিকদের একজন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৯৮৪ সালে তিনি জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় ছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর সমর্থনে আবারও সরকার গঠন করেন।

ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি ইহুদি হলেও ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি হিসেবে পরিচিত করে তুলেছেন। তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও জায়নবাদে বিশ্বাসী।

অন্যদিকে হাভিয়ের মিলেই জন্মসূত্রে রোমান ক্যাথলিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে ইহুদি ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করে আসছেন। তিনি নিয়মিত তোরাহ অধ্যয়ন করেন এবং দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছার কথাও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মিলেই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে একাধিক পদক্ষেপ নেন। রাজধানী বুয়েনস আইরেসের একজন অর্থোডক্স রাবাইকে তিনি নিজের প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাকে ইসরায়েলে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন।

ইহুদিদের কট্টরপন্থি হাসিদিক শাখা ‘চাবাদ-লুবাভিচ’-এর প্রতিও তিনি প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে অবস্থিত রাবাই মেনাচেম মেন্ডেল স্নিয়ারসনের সমাধিও তিনি একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন।

২০২৬ সালের জুন মাসে চাবাদের একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে তিনি ‘ইহুদি-খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের’ প্রশংসা করেন। এর আগে ২০২৫ সালে ‘জেনেসিস পুরস্কার’ লাভ করেন, যা ‘ইহুদি নোবেল’ নামেও পরিচিত। কোনো অ-ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনিই প্রথম এ সম্মান অর্জন করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মিলেইর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তিনি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান বলেও ঘোষণা করেছেন।

মিলেই তেল আবিব থেকে আর্জেন্টিনার দূতাবাস বিতর্কিত জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি ক্ষমতায় এসে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে অতীতে আর্জেন্টিনা অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলবিরোধী বা ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানে ভোট দিলেও মিলেইর নেতৃত্বে দেশটি এখন ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলবিরোধী একটি প্রস্তাবে ভোট দেওয়ায় নিজের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করেন তিনি।

মিলেইর মতে, ইসরায়েল চরমপন্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সভ্যতার একটি ‘সুরক্ষা প্রাচীর’ এবং ইসরায়েলের পরাজয় মানে পুরো পশ্চিমা বিশ্বের পরাজয়।

বিশ্লেষকদের অভিমত, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ফুটবলীয় আবেগের চেয়ে দুই নেতার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে মাঠে নেমেছে। তবে শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে তাদের ৩–২ গোলের জয় নিয়ে বিতর্ক থামছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে এগিয়ে ছিল মিশর। শেষ মুহূর্তে তিন গোল করে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচে একাধিক রেফারিং সিদ্ধান্ত ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে।