অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ নামক একটি বাণিজ্যচুক্তি তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কৃষি খাত, স্থানীয় শিল্প, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার অজুহাতে এই চুক্তিতে একতরফা সুবিধা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করেছে। এই চুক্তির পাতায় পাতায় সমতা ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে হলে বাংলাদেশকে মার্কিন তুলা ও সুতা ব্যবহার করতে হবে।বাংলাদেশ মূলত চীন, ভারত এবং পশ্চিম আফ্রিকা থেকে তুলামূলকভাবে কম দামে তুলা আমদানি করে। আমেরিকান তুলার দাম বরাবরই এসব দেশের তুলনায় প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ ডলার বেশি। কাছাকাছি দেশগুলোর সস্তা সাপ্লাইয়ার ছেড়ে দীর্ঘ দূরত্বের যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল সাপ্লাইয়ার থেকে তুলা কেনার বাধ্যবাধকতায় শেষ পর্যন্ত যে পরিমাণ শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দেখানো হয়েছে, তাতে অনেক বেশি অর্থের ব্যয় বাড়বে বাংলাদেশের।
চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি (এলএনজি), ১৫টি বোয়িং বিমান, প্রতিবছর সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, গরুর মাংস ইত্যাদি) কিনতে হবে।আমেরিকা থেকে সামরিক অস্ত্র কিনতেও বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬ হাজার ৭১০টি পণ্য বিনাশুল্কে আমদানি করতে দিতে হবে, যা দেশের স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্যে হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশের শত শত ওষুধ কোম্পানির বিকাশই ঘটেছে, জেনেটিক ওষুধ উৎপাদন করে, মেধাস্বত্ব আইনের ছাড় নিয়ে। আমরা পাড়ার দোকান থেকে ৫০ টাকায় জেনেরিক ড্রাগস কিনছি, এদিকে আমেরিকা বা ইউরোপে এই দাম হয়তো শতগুণ বেশি। আমাদের ওষুধশিল্প দেশের প্রায় সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাচ্ছে (৯৭ শতাংশ), আবার ১০০টি দেশে রপ্তানিও করছে। ওষুধশিল্পের এই জরুরি বিকাশটা সম্ভব হয়েছে এলডিসি হিসেবে পেটেন্ট আইনের শিথিলতা বা ছাড়ের কারণেই। এলডিসি থাকার সুবিধা হলো, ‘জেনেটিক’ ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশি কোম্পানির লাইসেন্স ও পেটেন্ট ফি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এখন বাংলাদেশকে যদি এলডিসি থেকে বের করা যায়, অথবা আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আইপি ফি পরিশোধ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের শত শত কোম্পানির পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে সস্তায় ওষুধ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। আমেরিকা সেটাই চায়। চুক্তিতে সেটা স্পষ্ট। অনিয়ন্ত্রিত মার্কেটে প্রশাসনিক এবং ‘জুডিশিয়াল’ অপ্রস্তুতির কারণে জেনেরিক ওষুধের দাম ১০০০ শতাংশ পর্যন্তও বৃদ্ধি পেতে পারে। শুধু দাম বাড়া নয় অনেক ওষুধ দুষ্প্রাপ্যও হয়ে উঠবে।
চুক্তির ধারা ৪-এর ১, ২ ও ৩ উপধারায় বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকে তা মেনে চলতে হবে এবং সে অনুযায়ী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে। এই বিধানের একটি তাৎক্ষণিক উদাহরণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। রাশিয়ার রোসাটম কর্তৃক নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম সরবরাহ অপরিহার্য। চুক্তির এই বিধান কার্যকর হলে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
চলমান জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনার সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এমন কোনো কেনাকাটায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। রাশিয়া থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর মাত্র ৬০ দিনের ‘ছাড়পত্র’ পাওয়া গেছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এটি কার্যত পরাধীনতার নামান্তর।
এই বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে কার্যত দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের ফাঁদে ফেলা হয়েছে। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এককথায় এই চুক্তি জাতীয় স্বার্থবিরোধী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাপ দেওয়া হয়েছে। এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি তিনটিই ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য কল্পিত সুবিধার কারণে দেশের সম্ভাবনাময় পোলট্রি, ডেইরি, ফার্মা, হালকা প্রকৌশল ও কৃষি খাতকে মার্কিন পণ্যের অবাধ আমদানির ঝুঁকির মধ্যে পড়বে? সামরিক আগ্রাসনের আগে এমন চুক্তি আমেরিকা সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের সঙ্গেও করেছিল।
ভারত আমেরিকার সাথে করা বাণিজ্য চুক্তিটি স্থগিত রেখেছে। ভারত রাশিয়া-ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার এই চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চুক্তির শর্তে রাজি না হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই তিনটি শক্তিশালী অর্থনীতির এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তারা যদি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিতে পারে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী এই অসম বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনার প্রস্তাব করলে বিধির অজুহাতে তাকে কথা বলা না দেওয়ার ঘটনা দু:খজনক।
সরকারের উচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে চুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রের অর্থনীতি,গণ সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শর্তগুলো চিহ্নিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চীন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করা। বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ও সংসদ এই বাণিজ্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ও চুক্তিতে সমতা আনতে জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই গণমানুষের প্রত্যাশা।