October 8, 2026, 6:57 pm

‘বাড়ি না ছাড়লে মেরে গুম করে দেব’—বৃদ্ধা ও প্রতিবন্ধী ছেলেকে ঘিরে আতঙ্ক

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মানিকপুর এলাকায় জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এক বৃদ্ধা ও তাঁর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে মারধর, বসতঘর ভাঙচুর এবং পরে ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জমি দখলের উদ্দেশ্যে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি বাড়ি না ছাড়লে মেরে গুম করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় নিরাপত্তা ও প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য শিবচর থানায় পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী বৃদ্ধা জরিনা বেগমের দাবি, গত ২১ আগস্ট রাতে কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বসতবাড়িতে প্রবেশ করে তাঁকে মারধর করেন। মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাঁর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে ঠান্ডু মিয়াকেও মারধর করা হয়। পরদিন গভীর রাতে তাঁদের বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ পরিবারের।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন জরিনা বেগম। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় জমি কিনে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর কবরও ওই জমিতে দেওয়া হয়েছে।

জরিনা বেগম বলেন, এই বাড়ি আমার স্বামীর। আমরা বহু বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। যে জমি নিয়ে তারা দাবি করছে, সেখানেই আমার স্বামীর কবর রয়েছে। আমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। না গেলে মেরে গুম করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে এখানে থাকি। আমার অন্য ছেলেরা ঢাকায় চাকরি করেন। এই সুযোগে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জরিনা বেগমের মেয়ে হোসনে আরা বেগম আদালতে দেওয়া অভিযোগে আটজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন সেকান্দার ব্যাপারী (৫০), এসকান্দার ব্যাপারী (৪৫), বেলায়েত তালী (২০), নাদিম তালী (২০), ইদ্রিস তালী (৫৫), নূর ইসলাম তালী (৩০), আনোয়ারা বেগম (৫৫) ও ফাতেমা বেগম (৪৫)।

অভিযোগে বলা হয়েছে, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময় তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২১ আগস্ট রাতে কয়েকজন ব্যক্তি রামদা, ছেনদা ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় জরিনা বেগমকে গালিগালাজ করা হয়। প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হয় এবং হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে ঠান্ডু মিয়াকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা এবং পরে লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার অভিযোগও করা হয়েছে।

পরিবারের দাবি, ওই ঘটনায় জরিনা বেগম ও ঠান্ডু মিয়া আহত হন। তাঁদের শরীরে এখনো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলার সময় বসতঘরের টিনের বেড়া ও চাল ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার।

এর পরদিন ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বসতঘরের চারপাশে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জরিনা বেগম চিৎকার শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ঘর থেকে তাঁর ছেলেকে বের করে আনেন।

জরিনা বেগম বলেন, আগুন লাগার পর আমি শুধু ছেলেকে কীভাবে বের করব, সেটাই ভাবছিলাম। আল্লাহর রহমতে দুজনই বের হতে পেরেছি। এখন রাত হলেই ভয় লাগে।

স্থানীয় সালিশ লিটন মাতুব্বর বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি মীমাংসার জন্য তাঁরা একাধিকবার চেষ্টা করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা কয়েক দফা সালিশ করেছি। বৃদ্ধ মহিলা প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকেন। তাঁর অন্য ছেলেরা ঢাকায় চাকরি করেন। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা মানা হয়নি। এরপর তাঁদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ও সালিশি শিবচর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ন আহবায়ক ঠান্ডু আকন বলেন,‘বিষয়টি নিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি। একজন বৃদ্ধ নারী ও তাঁর প্রতিবন্ধী ছেলের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটি আইনগতভাবে সমাধান করা উচিত। হামলা, ভয়ভীতি কিংবা আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে এলাকায় আরও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

তবে ভুক্তভোগী পরিবারের করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসকান্দার ব্যাপারী। তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা তাঁদের মারধরও করিনি। এসব অভিযোগ মিথ্যা।

শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, আদালত থেকে অভিযোগটি তদন্তের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি এবং হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।