রক্ষকই যখন ভক্ষকের ভূমিকায়, তখন বন বাঁচাবে কে? এমনই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বোয়ালি বিট এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে অসাধু বন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড়ের মহোৎসবে মেতে উঠেছেন। রাতভর চলছে গাছ কাটা, আর ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ট্রাক ও পিকআপে করে কাঠ পাচার হচ্ছে বিভিন্ন বাজারে।
রাতের অন্ধকারে করাতের শব্দ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাত থেকে শুরু হয় গাছ কাটার কাজ। একের পর এক করাতের শব্দে কেঁপে ওঠে বনভূমি। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাটা গাছ ট্রাকভর্তি করে সরিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঠ স্থানীয় বাজার ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সবাই জানে কী হচ্ছে। কিন্তু বলার কেউ নেই। যারা দেখার কথা, তারাই নাকি জড়িত।”
দিনে চাঁদাবাজির আসর
শুধু বন উজাড়েই থেমে নেই অভিযোগ। বিকাল হলেই শুরু হয় নতুন আরেক পর্ব—চাঁদাবাজি। রাস্তার পাশে টেবিল পেতে বসে একটি চক্র। বন থেকে আসা কাঠ, জ্বালানি লাকড়ি, এমনকি প্রস্তুতকৃত ফার্নিচারবাহী ট্রাক বা পিকআপ থামিয়ে আদায় করা হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। অভিযোগ আছে, বাসভর্তি ট্রাক থেকেও নেওয়া হচ্ছে চাঁদা।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এ যেন অলিখিত আইন—টাকা না দিলে গাড়ি চলবে না।”
প্রশাসনের নীরবতা
এতকিছুর পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই বলে দাবি এলাকাবাসীর। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় চলছে এই রমরমা বাণিজ্য? বন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধেই যখন অভিযোগ, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নির্বিচারে গাছ কাটতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কমে যাবে জীববৈচিত্র্য, বাড়বে তাপমাত্রা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। স্থানীয় কৃষকরাও আশঙ্কা করছেন, বন ধ্বংস হলে এর প্রভাব পড়বে কৃষি ও জলবায়ুর ওপর।
তদন্তের দাবি
এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, “বন বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।”
বনের রক্ষকরা যদি সত্যিই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তবে সেই বন আর কতদিন টিকে থাকবে—এ প্রশ্ন আজ বোয়ালিয়া বিটের আকাশে-বাতাসে।