September 6, 2026, 2:51 am
শিরোনাম:
ভেদরগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হলেন বিএম মোস্তাফিজ মোস্তফা বোয়ালমারীতে ১৬ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত তাড়াশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপন মধুখালীতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত-১ আহত -১৫ জিয়ানগরে শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শোভাযাত্র চৌদ্দগ্রাম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপন ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সংগঠন গাংচিলের সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর , ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ এর ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত নরসিংদীর শিবপুরের ভরতের কান্দিতে খুনি শাকিলের হাতে পিতা খুন আহত দুই ফরিদপুরের মধুখালীতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে সুপারভাইজার নিহত, আহত ১৫

লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ

শ্রী মিশুক চন্দ্র ভুঁইয়া, পটুয়াখালী

একদিকে অন্ধকারে বাংলাদেশ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ গিলছে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা
লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ—তবুও থামছে না বিদ্যুৎনির্ভর অটোরিকশার বিস্তার; রাষ্ট্র কি বিষয়টি দেখছে কখনো প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ নেই, কখনো গভীর রাতে হঠাৎ অন্ধকার। একজন মা হাতপাখা দিয়ে সন্তানকে বাতাস করছেন, একজন শিক্ষার্থী অন্ধকারে বই বন্ধ করে বসে আছে, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের কাজ থামিয়ে দিয়েছেন। কোথাও রোগী কষ্ট পাচ্ছেন, কোথাও কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের জন্য মানুষের এই হাহাকার যেন দিন দিন আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেই আরেকটি দৃশ্য চোখে পড়ছে—প্রতিদিন দেশের রাস্তায় নামছে হাজার হাজার নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
একটির পর একটি অটোরিকশা বাড়ছে। শহরে বাড়ছে, গ্রামে বাড়ছে,বাড়ছে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও বাড়ছে। মনে হচ্ছে, এই বৃদ্ধির কোনো সীমা নেই। আর প্রতিটি নতুন অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটি নতুন ব্যাটারি, একটি নতুন চার্জার এবং প্রতিদিন নতুন করে বিদ্যুতের চাহিদা।আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি—এই বিদ্যুৎ আসছে কোথা থেকে একটি অনুমানভিত্তিক হিসাব সামনে ধরলে বিষয়টির ব্যাপকতা আরও পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশের ৬৬৪টি থানা ধরে যদি প্রতিটি থানায় গড়ে ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধরা হয়, তাহলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ২০ হাজার। প্রতিটি অটোরিকশা প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জে ১৫ থেকে ২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে—এমন হিসাব ধরলে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ৪ কোটি ৯৮ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ
ভাবুন তো—একটি যানবাহনের বিদ্যুৎ খরচ যখন ৩৩ লাখের বেশি যানবাহনের সঙ্গে গুণ হয়, তখন সেই অঙ্ক আর ছোট থাকে না।
আর এখানেই আক্ষেপ।
যে দেশে বিদ্যুতের অভাবে মানুষ রাত জাগে, যে দেশে গরমের রাতে শিশুর কান্না থামাতে মা-বাবা হাতপাখা নিয়ে বসে থাকেন, যে দেশে শিক্ষার্থীরা লোডশেডিংয়ের কারণে পড়ার টেবিলে বসে থাকতে পারে না—সেই দেশে বিদ্যুৎনির্ভর যানবাহনের সংখ্যা যদি প্রতিদিন কোনো সুস্পষ্ট সীমা ও পরিকল্পনা ছাড়াই বাড়তে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা কি ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সংকট নিজেরাই আরও কঠিন করে তুলছি?বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধু উৎপাদন বাড়ালেই কি সমস্যার সমাধান হবে? বিদ্যুতের ব্যবহার কোথায় বাড়ছে, কোন খাতে কত বিদ্যুৎ যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কোন খাতে কতটা বাড়বে—সেই হিসাবও তো করতে হবে।
বিশেষ করে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং যদি একই সময়ে ব্যাপকভাবে শুরু হয়, তাহলে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একটি এলাকায় একসঙ্গে শত শত বা হাজার হাজার ব্যাটারি চার্জ হলে স্থানীয় ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই বিশাল চার্জিং ব্যবস্থার কোনো জাতীয় নিয়ন্ত্রণ আছে কি?
দেশে মোট কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোথায়?
তারা প্রতিদিন মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে—তার হিসাব কোথায়?
কতগুলো বৈধ চার্জিং স্টেশন আছে?
কতগুলো অনিয়ন্ত্রিত?
দিনের কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি চার্জ হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমাদের কাছে পরিষ্কার না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদার পরিকল্পনা কীভাবে করা হবে?
আক্ষেপের বিষয়, সাধারণ মানুষকে যখন বলা হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে, তখন তারা বাতি নিভিয়ে দেয়, ফ্যান বন্ধ করে দেয়, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহার কমিয়ে দেয়। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎনির্ভর একটি বিশাল পরিবহনখাত কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে—সেই হিসাব কি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে এখানে অটোরিকশাচালকদের দোষ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা জীবিকার জন্য গাড়ি চালান। যাত্রীও সাশ্রয়ী পরিবহন চান। সমস্যাটি অন্য জায়গায়—একটি বিশাল বিদ্যুৎনির্ভর পরিবহনব্যবস্থা যদি পরিকল্পনা ছাড়া বাড়তে থাকে, তার পরিণতি কী হবে, সেটি এখনই ভাবতে হবে।
লোডশেডিংয়ের জন্য শুধু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেই একমাত্র কারণ বলা যাবে না। উৎপাদন ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধিসহ অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু তাই বলে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদাকে উপেক্ষা করারও কোনো সুযোগ নেই।
কারণ আজ যে অটোরিকশা একটি, কাল তা দশটি; আজ যে সংখ্যা লাখে, কাল তা কোটিতে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন কি সেই গতিতে বাড়বে?রাষ্ট্রকে এখনই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। কিন্তু অটোরিকশার সংখ্যা, চার্জিং স্টেশন, চার্জিংয়ের সময় এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় জরিপ করা। প্রকৃত অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করা, তাদের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিমাপ করা, চার্জিং স্টেশনগুলো মিটারভিত্তিক করা এবং পিক আওয়ারে অপ্রয়োজনীয় চার্জিং কমিয়ে অফ-পিক সময়ে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা।
কারণ লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বসে থাকা মানুষ আর শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না—তারা জানতে চায়, বিদ্যুতের সংকট কেন হচ্ছে এবং কোথায় যাচ্ছে তাদের বিদ্যুৎ।আজ যদি আমরা এই হিসাব না করি, আগামীকাল হয়তো আরও বেশি অন্ধকারের মুখোমুখি হতে হবে।
একদিকে বিদ্যুতের জন্য মানুষের হাহাকার, অন্যদিকে প্রতিদিন বাড়ছে বিদ্যুৎনির্ভর অটোরিকশার বহর—এই বৈপরীত্য আর কতদিন চলবে?
সরকারের প্রতি তাই প্রশ্ন নয় শুধু—এখনই একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের সময়।
দেশের মানুষ অন্ধকারে থাকবে, আর বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তেই থাকবে—এটা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।আজই হিসাব করুন।
আজই পরিকল্পনা করুন।
আজই নিয়ন্ত্রণ আনুন।
কারণ বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্যটা শেষ পর্যন্ত কোনো পরিসংখ্যান দেয় না—মূল্যটা দেয় অন্ধকার ঘরে বসে থাকা সাধারণ মানুষ।