ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সঠিক ও জনকল্যাণমুখী চিন্তা কিভাবে একটি শহরের নাগরিক সেবার চিত্র বদলে দিতে পারে, তারই অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে ‘রংপুর ডায়েরি’। এটি শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়; রংপুরের নাগরিকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল তথ্যভান্ডার। একই সঙ্গে মানুষের মতামত, সমস্যা ও সৃজনশীল প্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। নাগরিক অধিকার ও মানবিক প্রয়োজনগুলোকে এক সুতোয় বাঁধতে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর এই প্লাটফর্মটি গড়ে তুলেছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা মো. আব্দুর রশিদ। সাধারণ মানুষকে অধিকার সচেতন করার পাশাপাশি নাগরিক সেবা ও প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির সহজ সমীকরণের কারণে সাড়া ফেলেছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম। ‘রংপুর ডায়েরি’ কাজ করছে একটি সমৃদ্ধ অনলাইন তথ্যভান্ডার হিসেবে। এখানে রংপুরের সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার-ঘাট, দর্শনীয় স্থান, স্থানীয় গণমাধ্যম এবং জরুরি সেবাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক জায়গায় সাজানো রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কোনোরকম হয়রানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ছাড়াই খুব সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। এতে যেমন সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ বাঁচছে, তেমনি দূর হচ্ছে নাগরিক ভোগান্তি। এছাড়াও এখানে নাগরিকরা যেমন তাদের সাহিত্যচর্চা, কবিতা ও গল্প শেয়ার করতে পারছেন, ঠিক তেমনি তুলে ধরতে পারছেন নিজ নিজ এলাকার নানা জনদুর্ভোগ ও সমস্যার কথা। নাগরিকদের এমন অভাব-অভিযোগগুলো ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে এনে দ্রæত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভ‚মিকা রাখছে। স¤প্রতি এই প্ল্যাটফর্ম থেকে নাগরিক সমস্যা তুলে নগরীর ২৪ নম্বম ওয়ার্ডের একটি ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ছবি পোস্ট করেন স্থানীয় এক যুবক। সেই ছবিটি গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরে আনে ‘রংপুর ডায়েরি’। এরপর সংবাদ প্রকাশ হলে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ভেঙে নতুন করে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ। বৈরাগীপাড়ার আমজাদ হোসেন নামে এক যুবক বলেন, নগনীর বৈরাগীপাড়া ও নূরপুর এলাকার মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি হয়ে চলাচল করে থাকেন। কয়েক বছর ধরে নড়বড়ে সেতুটির সংস্কারকাজ করা হবে বলে শুনে আসছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি। এখন সংস্কার না করে নতুন করে সেতুটি নির্মাণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের নজরে আনতে ‘রংপুর ডায়েরি’ প্লাটফর্মের সহযোগিতার একটি পোস্ট করলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেটা প্রচার করে। এই প্লাটফর্ম থেকে অনেক তথ্যসেবাও পাচ্ছি। একটা গ্রæপ রয়েছে, সেখানে আমরা সমস্যা ও পরামর্শ তুলে ধরতে পারছি। উদ্যোক্তা মো. আব্দুর রশিদ বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে খুব সহজে তাদের অধিকারের কথা বলতে পারেন, ঘরে বসেই তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পান। ‘রংপুর ডায়েরি’ হবে এমন একটি সেবামূলক প্লাটফর্ম, যেখানে শহরের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষও নিজের নাগরিক অধিকারের সর্বোচ্চ সুবিধাটুকু বুঝে পাবেন। বর্তমানে এই ওয়েবসাইটের ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে এবং নিয়মিত তথ্য আপডেট করা হচ্ছে। ওয়েবসাইটটি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই রংপুরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ‘রংপুর ডায়েরি’ শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়, এটি মানুষের কণ্ঠস্বর এবং রংপুরের একটি ডিজিটাল পরিচয় মাধ্যম বলে উল্লেখ করেন এই উদ্যোক্তা। তিনি আরও বলেন, রংপুর ডায়েরির ওয়েবসাইট িি.িৎধহমঢ়ঁৎফরধৎু.পড়স এরই মধ্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘রংপুর ডায়েরি’ এর অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপও প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমানে এড়ড়মষব চষধু ঝঃড়ৎব-এ রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে। অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সেবা, তথ্য অনুসন্ধান, অভিযোগ, মতামত এবং বিভিন্ন সুবিধা আরও সহজে পাওয়া যাবে। সচেতন নাগরিকদের মতে, ‘রংপুর ডায়েরি’ ভবিষ্যতে রংপুরবাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। কারণ এখানে তথ্য, নাগরিক অংশগ্রহণ, সামাজিক সচেতনতা এবং সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ সবকিছুকে একই ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট ও ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় মো. আব্দুর রশিদের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার উদাহরণ। পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার না হয়েও শুধুমাত্র একটি স্বপ্ন, মানবসেবার ইচ্ছা এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে রংপুরের মানুষের উপকারে আসতে পারে।