অধিক উৎস কর আরোপে রংপুর সিটি কর্পোরেশনে জমি ক্রয়-বিক্রির বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মানুষ আর্থিক সংকট বা বিশেষ প্রয়োজন কিংবা চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজন নিরুপায় হয়ে জীবিকা নির্বাহের উৎস জীবনের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে থাকেন। জমি বিক্রিতে ‘অধিক উৎসে কর’ আরোপের ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেকেই আর্থিক সংকটের সময় জমি বিক্রি না হওয়ায় সন্তানের বিয়ে ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ জমি ক্রেতার অনেক কমে গেছে। আর্থিক সংকট বা বিশেষ প্রয়োজনে ক্রেতার অভাবে অনেকেই জমি বিক্রি করতে পারছে না। সাধারণ ভূমি মালিকরা বৈধ ভূমি হস্তান্তর কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে অর্জি জানাবেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ করায় আর্থিক চাপে পড়েছে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ মানুষ। এমন উৎসে কর আরোপের ফলে অনেক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার জমি বিক্রি করতে পারছে না। ফলে এক বছরের ব্যবধানে দলিল নিবন্ধন কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। এই উৎসে কর স্থগিত বা বাতিল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বোর্ডের চেয়ারম্যানকে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন দুই-এক দিনের মধ্যে চিঠি দেবেন বলে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সিটি প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, সিটি কর্পোরেশনে নতুন সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ৭৯টি মৌজাকে পূর্ণাঙ্গ নগরায়ন না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ঘোষিত বাণিজ্যিক, আবাসিক বা শিল্প প্লট বহির্ভূত ‘চ’ শ্রেণির জমির হস্তান্তর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভূমি উৎস কর শতক প্রতি সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকার আওতামুক্ত রাখার অনুরোধ জানিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি লিখবেন। তিনি বলেন, রংপুর মূলত কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। কোনো শিল্প ভারি প্রতিষ্ঠান বা কলকারখানা নেই। জমির ফসল বিক্রি করে এ অঞ্চলের মানুষ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন। এ কারণে তাদের হাতে মজুত অর্থ বা টাকা থাকে না। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানের বিয়ে কিংবা পরিবারের কোনো বড় ধরণের আর্থিক ব্যয়ের জন্য জমি বিক্রি করে তা পূরণ করেন। কিন্তু জমি বিক্রির উৎসে করের এ বিপুল রাজস্বের টাকা পরিশোধ করার পর জমি বিক্রির টাকার অঙ্ক যৎসামান্য থাকে। ফলে জমি বিক্রি ও ক্রেতাও কমে গেছে। এর ফলে এসব পরিবার সন্তানের বিয়ে ও পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। জমির বিক্রির পরিমাণও কমে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব
বোর্ডের শরণাপন্ন হবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ৫ জুলাইয়ের জারিকৃত গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ‘চ’ শ্রেণির জমি হস্তান্তর/বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি শতাংশ জমির বিক্রয়মূল্যের ৩ শতাংশ অথবা সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা, যা অধিক, উৎসে কর হিসেবে আদায়ের বিধান কার্যকর করেছে। তিনি বলেন, পূর্বের এনবিআর চেয়ারম্যানের সময়ে যে গেজেট হয়েছে তা অমানবিক এবং বাস্তবসম্মত নয়। আশা করা হচ্ছে নতুন চেয়ারম্যান এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। রংপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠাকালে ১৫টি ওয়ার্ডের আওতায় মোট ৩৬টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে আরও ৭৯টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিটি কর্পোরেশনের এসব এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, উল্লেখিত ৭৯টি মৌজার অধিকাংশ এখনও কৃষিনির্ভর, গ্রামীণ ও সীমিত অবকাঠামোগত সুবিধাস¤পন্ন এলাকা হিসেবে বিদ্যমান। এসব এলাকায় ভূমির বাজারমূল্য শতাংশ প্রতি ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ পরিবেশ ও অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে সিটি কর্পোরেশন এসব এলাকা থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ ভূমির প্রকৃত বাজারমূল্য, স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কর প্রদানের সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সাধারণ ভূমি মালিকরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপে পড়েছে এবং বৈধ ভূমি হস্তান্তর কার্যক্রম নিরুৎসাহিত হচ্ছে। রংপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ৭৯টি মৌজায় ২০২৪ সালে মোট ২ হাজার ৭৮১টি দলিল নিবন্ধিত হলেও ২০২৫ সালে তা হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৭৪৯টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩২টি দলিল কম নিবন্ধিত হয়েছে, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ কম। কর প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে দেখা যায়, অধিক করের ফলে ভূমি লেনদেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং নিবন্ধন কার্যক্রম হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কাঙ্খিত রাজস্ব বৃদ্ধির পরিবর্তে রাজস্ব আহরণের ভিত্তিই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভূমি বাজারে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।