“জীবিত অবস্থায়ই যদি নিজের জমানো টাকা না পেলাম, তবে মৃত্যুর পর সেই টাকা আমার কী কাজে লাগবে?”—আবেগঘন কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. শাহজাহান মিয়া।
প্রায় চার দশক সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অবসরে যান তিনি। কিন্তু অবসরের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি পাওনা হিসেবে অবসর ও কল্যাণ ভাতার একটি টাকাও হাতে পাননি এই ৬২ বছর বয়সী প্রবীণ। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ অনলাইনে আবেদন করা হলেও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি তাঁর আবেদন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফাইল আটকে থাকায় চরম অনিশ্চয়তা ও অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাঁর।
গলাচিপার রতনদী-তালতলী ইউনিয়নের উলানিয়া এলাকায় শাহজাহান মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটে তিনি প্রায় ভেঙে পড়েছেন। স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন। দুই ছেলে থাকলেও তারা বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেন না বলেই জানান তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহজাহান মিয়া বলেন, “সারা জীবন চাকরি করে সংসার চালিয়েছি। বেতনের টাকা থেকে নিয়মিত ১০ শতাংশ কেটে অবসর তহবিলে জমা হয়েছে। এখন শেষ বয়সে এসে নিজের সেই টাকাটাই পাচ্ছি না। জানি না জীবিত অবস্থায় আর হাতে পাব কি না।”
শাহজাহান মিয়ার প্রতিবেশী ও একই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবর রহমান জানান, প্রবীণ এই কর্মচারী বর্তমানে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সংসারের অভাব এতটাই প্রকট যে নিয়মিত দুবেলা খাবারের সংস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারছেন না তিনি।
উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, অবসরের পর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র যথাসময়ে অনলাইনে সফলভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, “সংশ্লিষ্ট দপ্তর এখনো ২০২২ সালের অনেক আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারেনি। শাহজাহান মিয়া অবসরে গেছেন ২০২৪ সালে। ফলে তাঁর মতো হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকার দ্রুত অবসর ও কল্যাণ ভাতার অর্থ ছাড় করলে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।”
গলাচিপা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষা অফিসের সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। আবেদনগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকেই আইডি নম্বরের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিম্ন আয়ের অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারী তাঁদের শেষ বয়সের প্রধান আর্থিক ভরসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মানবিক বিবেচনায় দ্রুত শাহজাহান মিয়ার পাওনা অর্থ পরিশোধ করে তাঁর দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবার, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা।