লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে নাম ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন এক ব্যক্তির জমি দাবির অভিযোগে মৃত নুর নবীর দুই সন্তানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) মাধ্যমে ১ মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, কোনো বৈধ কাগজপত্র না দেখে এবং উপযুক্ত কারণ ছাড়াই কমলনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আরাফাত হুসাইন তাদের জেলে পাঠিয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
### ঘটনার সূত্রপাত ও বিতর্কিত কারাদণ্ড
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে মোসলে উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি মৃত নুর নবীর ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে কমলনগর উপজেলা ভূমি অফিসে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আরাফাত হুসাইন উভয় পক্ষকে দলিল ও খতিয়ানসহ হাজির হওয়ার নোটিশ দেন।
মৃত নুর নবীর দুই সন্তান ইকবাল ও নয়ন বেগমসহ ওয়ারিশরা শুনানির দিন তাদের মালিকানা দলিল ও খতিয়ান নিয়ে হাজির হন। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসিল্যান্ড তাদের বৈধ কাগজপত্র না দেখেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ মাসের সাজা দিয়ে হাজতে পাঠান।
এ বিষয়ে সাংবাদিকরা সরজমিনে গিয়ে এসিল্যান্ড মোহাম্মদ আরাফাত হুসাইনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন: "বাদি মোসলে উদ্দিনের মালিকানা পাওয়া গেছে। কিন্তু তিনটি শুনানিতে বিবাদী পক্ষ কোনো মালিকানা দলিল বা খতিয়ান দেখাতে না পারায় তাদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসামিরা চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন।"
তবে সাংবাদিকরা ভুক্তভোগী পরিবারের দলিল ও খতিয়ান দেখালে তিনি দাবি করেন, শুনানির দিন এই ধরনের কোনো কাগজপত্র আসামিদের সাথে ছিল না।
মৃত নুর নবীর মালিকানা স্বত্ব (ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি):
• দলিল নং: ১৯৫০ (২৫/০১/১৯৮০) এবং ৯২৫০ (২১/০৪/১৯৮৪)
• খতিয়ান নং: ২০১, ১৬৩, ৬৭ (নামজারি নথি- ৫০৭)
• জমির পরিমাণ: ৮৬ শতাংশ (দীর্ঘ ৩৫-৪০ বছর যাবত বসতবাড়ি করে ভোগদখলে আছেন)
বাদি মোসলে উদ্দিন উধাও, পুলিশ পাচ্ছে না ঠিকানা
স্থানাীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, 'মোসলে উদ্দিন' নামের কোনো ব্যক্তিকে তারা চেনেন না এবং এলাকায় তার কোনো বাড়ি বা ঠিকানা নেই। কেউ কেউ তার বাড়ি ভোলা জেলায় বলে ধারণা করলেও সঠিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের খোঁজ কারো জানা নেই।
ভূমি অফিসে অভিযোগ দায়েরের পর তদন্ত ও বৈঠকের সিদ্ধান্ত হলে বাদি মোসলে উদ্দিন গা-ঢাকা দেয়। বর্তমানে ভুক্তভোগীদের মামলার পর পুলিশও তার কোনো হদিস বা ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন বলেন, "মোসলে উদ্দিন ও তার মালিকানা সম্পূর্ণ ভিউয়া। নুর নবী কোনোদিন জমি বিক্রি করেননি। পরিকল্পিতভাবে নাটক সাজিয়ে ইকবাল ও নয়নকে জেলে পাঠানো হয়েছে।"
### ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৃত নুর নবীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও তার সন্তানসহ ২৫ জন ওয়ারিশ বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা জজকোর্ট দেওয়ানি আদালতে মোসলে উদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নং- ৪৬/২৬)।
নুর নবীর মেয়ে নাজমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন এবং বদ্ধি বেপারী নামের দুই ব্যক্তি বাদি মোসলে উদ্দিনের সাথে যোগসাজশ করে তাদের বসতভিটা ছাড়া করার পরিকল্পনা করছেন। তারা ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তার ভাই ইকবাল ও বোন নয়নকে জেলে পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, মোহাম্মদ বেপারী ও তার সন্তানেরা জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়ির মাটি ও ৫টি গাছ কেটে নিয়ে গেছে এবং বাধা দিতে গেলে প্রতিনিয়ত খুন-গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
চাঁদা দাবি ও ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, "আমি এই ঘটনার সাথে জড়িত নই। কেউ যদি আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দেয়, তবে তা আমার মানহানির শামিল।" অন্যদিকে, বাদি মোসলে উদ্দিনের কোনো ঠিকানা না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
# এলাকাবাসীর দাবি ও নিরাপত্তা হীনতা
মিথ্যা মামলায় দুই ভাই-বোনের কারাদণ্ডের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে এলাকার সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন যেন অনতিবিলম্বে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আসল অপরাধী ও জালিয়াত চক্রকে খুঁজে বের করে এবং নিরীহ ইকবাল ও নয়নকে জামিনে মুক্তি দেয়। একই সাথে, অসহায় এই পরিবারটি বর্তমানে চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছে। তারা প্রশাসনের কাছে জানমালের জরুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।