তথ্য ফাঁসের ভয়ে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, আইনের তোয়াক্কা করেন না চক্রের হোতারা
রাজধানীর মিরপুর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় বাসা ভাড়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ও প্রভাবশালী অবৈধ সিন্ডিকেট।
প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে এখানে সোনা চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
আর এই চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত খোদ বাড়ির মালিক ও তার পরিবার। সম্প্রতি এই অবৈধ ব্যবসার তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে এক নিরীহ ভাড়াটিয়াকে নানা অজুহাতে ও পুলিশি ভয় দেখিয়ে উচ্ছেদ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ওই বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে।
তথ্য ফাঁসের ভয়ে নাটকীয় উচ্ছেদ
অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে শান্তিসুলভভাবে বসবাস করে আসছিলেন।
সম্প্রতি বাড়ির মালিকের সোনা চোরাচালানসহ নানাবিধ গোপন ও অবৈধ ব্যবসার কথা ভাড়াটিয়া জেনে যান।
নিজের অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ওই বাড়িওয়ালা।
এরপরই শুরু হয় ভাড়াটিয়াকে তাড়ানোর নানা ফন্দিফিকির।
বিভিন্ন কাল্পনিক ইস্যু ও অজুহাত তৈরি করে ওই ভাড়াটিয়া পরিবারকে মানসিকভাবে হয়রানি করা শুরু হয়। শেষমেশ নিজের অপরাধ ঢাকতে বাড়িওয়ালা নিজেই থানায় একটি সাজানো ও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন।
পরবর্তীতে পুলিশি নোটিশ ও আইনি ঝামেলার ভয় দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে ওই ভাড়াটিয়াকে বাসা থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে দেওয়া হয়।
ফোনালাপে স্বর্ণের বিস্কুট ও চোরাচালানের তথ্য ফাঁস
অনুসন্ধানে এই চক্রের অপরাধের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
জানা গেছে, বাড়িওয়ালার ছেলে 'দ্বীপ' (যিনি স্থানীয়ভাবে বিহারী ঘটি নামে পরিচিত) সরাসরি এই স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে যুক্ত। দ্বীপের মোবাইল ফোনে চোরাচালানের অর্থ লেনদেন ও পাচারের বিষয়ে একাধিকবার কথোপকথন হয়েছে।
এমনকি মোটা অঙ্কের স্বর্ণের বিস্কুট হস্তান্তরের বিষয়েও দ্বীপের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে রাতারাতি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক বনে গেছে এই পরিবারটি।
পুরনো ভাড়াটিয়াদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার
গোপন সূত্রে আরও জানা গেছে, এই বাড়িওয়ালা অত্যন্ত চতুর ও প্রভাবশালী।
বাড়িতে যেসব পুরনো ভাড়াটিয়া বসবাস করছেন, তাদেরকে বিভিন্নভাবে চাপ দিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে নিজের 'সাক্ষী' হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি।
কোনো ভাড়াটিয়া বা বাইরের কোনো সচেতন নাগরিক যদি তাদের এই অবৈধ কাজের প্রতিবাদ করতে চায়, তবে এই পুরনো ভাড়াটিয়াদের ঢাল হিসেবে সামনে এনে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
"আইন-আদালত পরোয়া করি না": বাড়িওয়ালার দম্ভ
স্থানীয়দের মতে, এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে তারা দেশের প্রচলিত আইনকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
বাড়িওয়ালা দ্বীপের মা প্রকাশ্যেই দম্ভোক্তি করে বেড়ান যে, "কেস-মামলা, আইন-আদালতকে তারা পরোয়া করেন না।"
প্রশাসন বা আইনকে তারা বিন্দুমাত্র ভয় পান না বলেও এলাকায় প্রচার করেন, যা স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
টাকার লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদ
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও গোপন সূত্র মারফত জানা গেছে, এই পরিবারের প্রতারণার জাল কেবল বাসা ভাড়া বা চোরাচালানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে অসহায় বা বিপদে পড়া মানুষকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে, আবার কখনো বড় অঙ্কের মুনাফার লোভ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন তারা।
সরলতার সুযোগ নিয়ে মানুষের সাথে এমন আর্থিক প্রতারণা করা তাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
কঠোর পদক্ষেপ চায় এলাকাবাসী
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিল্লাত ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দা জানান, বাসা ভাড়ার আড়ালে এমন ভয়ংকর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকার সামাজিক পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে।
সোনা চোরাচালানের মতো রাষ্ট্রীয় অপরাধ এবং নিরীহ মানুষকে অন্যায়ভাবে হয়রানির এই ঘটনার পেছনে মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন মহল।