রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ১২টি এসির সবগুলোই বিকল। ২৬টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ৫টি পুরোপুরি অকেজো, বাকিগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে অন্তত পাঁচ বছর আগে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টটিও বিকল হওয়ার পথে। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় ডায়ালাইসিস কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের একমাত্র ভরসা এই ইউনিট। এখানে তিন শিফটে প্রতিদিন ৭২ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। মাত্র ২০ হাজার টাকায় ছয় মাস মেয়াদি ডায়ালাইসিসের সুবিধা পাওয়ায় দরিদ্র রোগীরা এখানেই ভিড় করেন। ২০১০ সালে ৩৯টি মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ১৩টি আগেই নষ্ট হয়েছে। বর্তমানে ২৬টির মধ্যে ৫টি অচল হওয়ায় বাকি ২১টি দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম। কর্মরতরা বলেন, ১৬ বছর ধরে চলা এসব মেশিনের আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ফলে শতভাগ সঠিক ডায়ালাইসিস হওয়া নিয়ে খোদ টেকনিশিয়ান ও চিকিৎসকেরাই সংশয় প্রকাশ করেছেন। এদিকে গত ২৬ দিন ধরে ওয়ার্ডের ১২টি এসির সবগুলো বিকল হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ডের ইনচার্জ আনিসুর রহমান বলেন, ডায়ালাইসিস মেশিন নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সচল রাখতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। এসি না থাকায় একদিকে মেশিনের ওপর চাপ পড়ছে, অন্যদিকে তীব্র গরমে রোগীদের ৪-৫ ঘণ্টা অমানবিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, গøাসঘেরা ওয়ার্ডটিতে সিলিং ফ্যান লাগানোর ব্যবস্থা নেই। ডায়ালাইসিস নিতে আসা রোগীরা বাড়ি থেকে ছোট হাতপাখা বা ইলেকট্রিক ফ্যান নিয়ে এসেছেন। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা গাইবান্ধার মমতাজ বেগম, লালমনিরহাটের আফজাল হোসেন ও কুড়িগ্রামের আখতার হোসেন বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে চার ঘণ্টা গরমে বসে থাকা অসহ্য যন্ত্রণার। প্রশাসনের দায়িত্বহীনতাকেই তারা এমন অবস্থার জন্য দায়ী করেন। ওয়ার্ডের ইনচার্জ বলেন, ডায়ালাইসিস মেশিন ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের বেহাল অবস্থার পাশাপাশি জনবলসংকটও তীব্র। মাত্র একজন সহকারী ও একজন পিয়ন দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন নার্স বলেন, ডায়ালাইসিস ফি বাবদ বছরে ১ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে কর্তৃপক্ষের আগ্রহ নেই। বিষয়টি পরিচালককে লিখিতভাবে জানিয়েও লাভ হয়নি। সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে বড় কোনো সমস্যা নেই। দু-একটি এসি নষ্ট থাকতে পারে, সেগুলো দ্রæত ঠিক হয়ে যাবে। কিডনি আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের আশঙ্কা, দ্রæত নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপন ও এসি সচল করা না হলে শত শত রোগী বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে পড়বে। এছাড়াও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২৪টি, ৩টি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে ২টি, ৩টি এমআরআই মেশিনের মধ্যে ২টি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি অচল রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগী কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছে তারা। হাসপাতালের বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক কক্ষেই ধুলোবালি ও ময়লা জমে রয়েছে, কোথাও কোথাও দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২০টি মেরামতের অযোগ্য। এছাড়া ৩টি সিটি স্ক্যানের মধ্যে ২টি, ৩টি এমআরআই মেশিনের মধ্যে ২টি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ৮টি মেরামতযোগ্য নয়। রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রায়ই তাদেরকে হাসপাতালের বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। পীরগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন বকুল মিয়া বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি সব পরীক্ষা বাইরে করতে হয়, তাহলে গরিব মানুষের জন্য এই হাসপাতালের সুবিধা কোথায়? একটি সিটি স্ক্যান করাতেই কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। দিনাজপুর থেকে আসা এক রোগী বলেন, চিকিৎসক পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে মেশিন সচল না থাকায় বাইরে যেতে বলা হয়েছে। অনেকেই টাকা জোগাড় করতে না পেরে পরীক্ষা করাতেই পারছেন না। আরেক রোগীর অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে জনবল কম থাকায় রোগীদের নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই সুযোগে কিছু অসাধু দালাল রোগীদের বিভ্রান্ত করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। জনবল সংকটের কারণে অনেক মেশিন সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সুযোগে একটি দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রংপুর মেডিকেলে যন্ত্রপাতি সচল করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দালালচক্র নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জনগণ যেন দ্রæত সুফল পায়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও সচল যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে দ্রæত সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত ১৪ জুন সকাল ১০টার দিকে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী ও রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান। সংসদ সদস্যরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ কক্ষ ঘুরে দেখেন। এ সময় দেখা যায়, বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক কক্ষেই ধুলোবালি ও ময়লা জমে রয়েছে, কোথাও কোথাও দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।