তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচর-যেখানে একসময় ছিল শুধুই ধু-ধু বালির স্তূপ আর অনাবাদি জমি, সেখানে আজ সবুজের সমারোহ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটি কাপাসিয়া ও বাদামের চর এলাকায় তরমুজের বাম্পার ফলন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে শুরু থেকেই যিনি নিবিড়ভাবে কৃষকদের পাশে থেকেছেন, তিনি হলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলাম।
চরাঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশে কৃষিকে এগিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়। বালুময় জমি, পানির সংকট ও অনিশ্চিত আবহাওয়া-সবকিছু মিলিয়ে এখানে চাষাবাদ ছিল একপ্রকার অসম্ভব। কিন্তু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলামের পরিকল্পনা, দিকনির্দেশনা এবং কৃষকদের প্রতি নিয়মিত পরামর্শই বদলে দিয়েছে এই চিত্র। তার উদ্যোগেই কৃষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
রাশিদুল ইসলামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কৃষকরা আশ্বিন মাসে বালুচরে তরমুজের বীজ বপন করেন। তিনি নিজেই মাঠে গিয়ে কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শেখান। বিশেষ করে 'মালচিং' পদ্ধতির ব্যবহার এবং ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি প্রয়োগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেন। ফলে বালুচরের মতো প্রতিকূল জমিতেও আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং অল্প পানিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলাম বলেন, 'চরাঞ্চলের অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ শুরু করি। কৃষকদের আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং মাঠ পর্যায়ে সহায়তা দিয়েছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বালুচরেও ভালো ফলন সম্ভব-এটাই আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি।
তার এই পরিকল্পিত উদ্যোগের ফলেই আজ চৈত্র মাসে মাঠজুড়ে দেখা যাচ্ছে পাকা তরমুজের সমারোহ। কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। প্রতি বিঘা জমি থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করছেন তারা, যা তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া বলেন, রাশিদুল ইসলাম স্যার আমাদের শুরু থেকেই পাশে ছিলেন। কীভাবে চাষ করতে হবে, কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে-সবকিছু তিনি হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। তার দিকনির্দেশনা না থাকলে আমরা এই সাফল্য পেতাম না।
আরেক কৃষক আলী আজগর মন্ডল বলেন, স্যারের পরামর্শে আমরা নতুনভাবে কাজ শুরু করি। এখন ফলন দেখে আমরা নিজেরাই অবাক। এই বালুচর এখন আমাদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে।
রাশিদুল ইসলাম আরও জানান, আমরা চাই এই সাফল্য শুধু একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ না থাকে। আগামী মৌসুমে আরও বেশি কৃষককে এই চাষে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি তরমুজের পাশাপাশি পেঁপে, মরিচসহ অন্যান্য ফসল চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তার নেতৃত্বে কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতা কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। শুধু উৎপাদন নয়, বাজারজাতকরণ নিয়েও কৃষকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পেতে পারেন।
চরাঞ্চলের এই সাফল্য ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক কৃষক সুন্দরগঞ্জে এসে এই পদ্ধতি দেখে নিজ নিজ এলাকায় প্রয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এতে করে চরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উপকরণে ভর্তুকি এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা পেলে কৃষকরা আরও বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারবেন।
তিস্তার বালুচর আজ আর অনাবাদি নয়-এটি এখন সম্ভাবনার নতুন নাম। আর এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন কৃষকদের পাশাপাশি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলামের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা। তার পরিকল্পনা, শ্রম ও আন্তরিকতায় বালুচর জেগে উঠেছে সবুজে, আর কৃষকের ঘরে ফিরেছে স্বপ্নের হাসি।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তরমুজ চাষের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত-যেখানে একজন কর্মকর্তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও কৃষকদের পরিশ্রম মিলেই সৃষ্টি করেছে নতুন এক সম্ভাবনার গল্প।